ড. ইউনূস সরকারের সাত মাসের গৌরবময় খতিয়ান!

0
21

রতন তালুকদার : ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে একদফা আন্দোলনে ৫ই আগস্ট মাথানত করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লজ্জাজনক পলায়ন। ৫ থেকে ৭ই আগস্ট পর্যন্ত দেশে কোনো সরকার ছিল না। কথিত ছাত্রদের নিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশের নোবেল বিজয়ী মহামতি ড. ইউনূস প্যারিস থেকে ঢাকায় এসে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। সদা হাস্যোজ্জ্বল ইউনূসের মুখ আর দেশের মানুষের উল্লাসে সারাদেশে ‘ইউনূস বসন্ত’। শেখ হাসিনার বিদায়ে মাতোয়ারা ছাত্রসমাজ, জনগণ। হাসতে হাসতে গণভবনে হরিলুট। মানুষ চেয়ে চেয়ে দেখছে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি চোখের পলকেই মাটিতে মিশে গেল।
ড. ইউনূস ৮ই আগস্ট শপথ নিলেন, সাক্ষী রইল দেশের রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব, জামায়াত সহ ইসলামী দলের হুজুরদ্বয়, সামরিক-বেসামরিক কর্মকতা, সাংবাদিক-বুদ্বিজীবী ও বিজয়ী ছাত্রজনতা। আওয়ামীলীগ নেত্রীর পলায়নের গøানি মাথায় নিয়ে দলের নেতাকর্মীরা অন্ধকারে পালানোর রাস্তা খুঁজছে।
৮ই আগস্ট ইউনূস অভিষিক্ত হওয়ার পর নিজের ইচ্ছেমতো নিজ বলয়ের মানুষজন ও ছাত্র আন্দোলনের কতিপয় নেতা দিয়ে ঘেরা হলো উপদেষ্টা পরিষদ। অগ্রযাত্রা শুরুর পর তিনমাস হানিমুন বাদ দিলে আরও প্রায় ৫ মাস। সর্বসাকুল্যে ইউনূস সরকারের গৌরব,ঘৃণার আট মাস প্রায়।
তারপর কী হলো? সবিস্তারে ইউনূসনামার খতিয়ান নিয়ে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বলছি, আপনারাও জোরেশোরে বলুন।
“ইউনূস সরকারের ৮ মাস, আ-হা বেশ! বেশ!”
ড. ইউনূস সরকারের ৮ মাসের শাসনামলে খতিয়ানগুলো জেনে নিন, প্রাণ খুলে হাসুন! আর কতদূর যাবো আমরা ?

(১) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম সপ্তাহেই প্রশাসনে ব্যাপক পরিবর্তন। আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আখ্যায়িত করে প্রশাসনে মৌলবাদী ইসলামী মনোভাবাপন্নদের নিয়োগ। সংস্কারের অজুহাতে ৬টি কমিটি গ্রহণ। এইসব কমিটিতে ড. ইউনূস সমর্থিত পেশাজীবীদের নিয়োগ। দেশ ও বিদেশ থেকে ভাড়া করা তথাকথিত পÐিতদের নিয়ে জগাখিচুড়ির সংস্কারমূলক প্রস্তাবনা।
(২) ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কারী নামে কতিপয় ছাত্রদের লাগামহীন দৌরাত্ম্য, বাচ্চা পোলাপানের অতিমাত্রায় বাচলামির খেসারতে শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্য, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুম রাজনীতির আখড়ায় পরিণত। সমন্বয়কারী হিসেবে সারাদেশে চাঁদাবাজির উৎসব, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, ছোট ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত।
(৩) আইন-শৃঙ্খলায় গুরুতর অবনতি। দেশে আনসার বিদ্রোহ, পুলিশের মাঝে ভয়, চেইন অব কমান্ড নেই পুলিশে। ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীদের দ্বারা অপকর্মে ভীত-সন্ত্রস্ত পুলিশের কাজে যোগদানে অনীহা, জানমাল নিরাপত্তার অভাব। সরকার বাধ্য হয় সেনাবাহিনীকে মেজিস্ট্রি পাওয়ার দিয়ে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।
(৪) “ডেভিল হান্টার” অপারেশনের নামে হাজার হাজার নাগরিককে গ্রেপ্তার, একেকজনের মাথার উপর মামলার বোঝা। কারণ-অকারণে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের শায়েস্তা করার নামে হয়রানি, আইন-শৃঙ্খলার গুরুতর অবনতির কারণে সারাদেশে চুরি-ডাকাতি,ছিনতাই,মব হামলা, সম্প্রীতির নামে নৈরাজ্য। ৮ মাসে প্রায় দু’শত বিচার বর্হিভূত হত্যাকাÐ, গুম-ধর্ষণসহ অসামাজিক কর্মকাÐ বেড়েছে লাগামহীন!
(৫) ড. ইউনূস ক্ষমতা নেয়ার আগ থেকেই অর্থাৎ সেই ৫ আগস্ট থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত জেলের কয়েদিরা জেল ভেঙ্গে পালিয়ে যায়। ইউনূস ক্ষমতা নেয়ার পর জেল থেকে বেছে বেছে দাগি আসামি, ফাঁসির আদেশে অভিযুক্ত জংগীসহ অনেক আসামিকে ছেড়ে দেয়া হয়।
(৬) বিএনপিকে খুশি করতে খালেদা জিয়াকে সব মামলা থেকে রেহাই দিয়ে পড়ে মুক্তি। লন্ডন প্রবাসী তারেক রহমানের মামলাগুলি পর্যায়ক্রমে বাতিল হলেও কয়েকটি মামলার মূলা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তারেক রহমান নিয়ে যাতে ভবিষ্যৎ-এ খেলা যায়। বিএনপি কী আদৌ এই শুভংকরের ফাঁকি বুঝতে পারে?
(৭) প্রতিবেশী ভারতের সাথে অলিখিত যুদ্ধ ঘোষণার ফলে ৫ আগস্টের পর দেশে ভারত-বিদ্বেষ বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। ড. ইউনূস ৮ই আগস্ট দেশের মাটিতে পা রাখার আগেই প্যারিস এয়ারপোর্টে ভারতের উত্তর-পূর্বে “চিকেন নেক” নিয়ে সংকেত দেন। তারপর দেশে শুরু হয়ে যায় ভারত বিরোধিতার মহোৎসব আর ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দুদের অত্যাচার, মন্দির ভাংচুর ফলে নিরাপত্তা হীনতায় ভুগতে থাকে হিন্দুরা। রাস্তায় নামে সনাতন ধর্মের মানুষজন। ঢাকা চট্টগ্রামে হিন্দুদের সমাবেশ ও বিক্ষোভ, শ্রী চিন্ময় প্রভুর আবির্ভাব, তারপর তাকে গ্রেপ্তার। চট্টগ্রামে জজকোর্টে মারমুখী সংঘাত, সাইফুল নামে একজন তরুণ আইনজীবীর মর্মান্তিক মৃত্যু।
(৮) ভারতের বিপরীত পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন করে প্রেমে উতলা হওয়া। জাহাজ, আলু-পেঁয়াজ, তেল-চিনি আসা শুরু। পাকিস্তানি হানাদার নতুন পোষাকে আসতে শুরু করে। অজুহাত, সম্পর্ক উন্নয়ন। দীর্ঘদিন পাকিপ্রেম না থাকায় অল্প দিনেই পুুষিয়ে নেয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
(৯) প্রথম দিন থেকেই ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও তার চেতনাকে মুছে ফেলার চক্রান্ত শুরু হয়। দু’ঘণ্টার ব্যবধানে সারা দেশে বঙ্গবন্ধুর স্টেচ্যু, মোড়াল মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের নিশানাকে মাটি চাপা দেয়ার নিরলস প্রচেষ্টা চলতে থাকে। প্রথমদিকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালানো হলো, তারপর তো একেবারে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। আঘাত আসে মুুক্তিযুদ্ধের যাদুঘরে। এবার একুশের মহান দিনেও ছিল অবহেলা ও অনাদরের ছবি। ৭ই মাচের্র সেই বজ্রকন্ঠের গর্জন? প্রশ্নই উঠে না, নীরবে স্বাধীনতার মার্চ মাস যেন লুকোচুরি খেলছে। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, জয়বাংলা বলাই যেন অপরাধ!
(১) তারপর শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও পরে মর্মান্তিক মৃত্যু। এই পবিত্র রমজান মাসেও এই অমানবিক পৌশাচিক এবং নৈরাজ্যের ছবি দেখতে হয় জাতিকে। একটি আট বছরের শিশুকে জীবন দিতে হয় দেশে আইন-শৃঙ্খলা অবনতির কারণে। আছিয়ার ধর্ষক ধরেই নিয়েছিলো কিচ্ছু হবে না, দেশে সরকার আছে আইন নেই, বিচার নেই। সেই বিচার বিভাগেও চলছে আগের মতোই পক্ষপাতিত্ব। যে আমার মানুষ সে মুক্ত, যে আমার নয় সে জেলে থাকবে এই নীতিই কোর্টের বারান্দায়।
(১১) অবশেষে কিংস পার্টি! পোলাপানের রাজনৈতিক দল। কোটি কোটি টাকার খেলা, হেলিকপ্টারে চড়ে কম্বল বিতরণ, ফাইভস্টার হোটেলে হাজার লোকের ইফতার! সমন্বয়কারীদের বিলাসবহুল গাড়ি, ব্র্যান্ডের জামাকাপড়, রঙ্গিন জীবনযাপন। অথচ এই পোলাপানগুলি আট মাস আগে বেকার ছিলো, দোকানে বাকিতে চলতো! ওদের এই বিশাল অর্থ-বিত্ত-বৈভব-এর উৎস কী!
শেষ কথা, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস আপনি দ্রæত নির্বাচন দিন, নিজে বাঁচুন দেশকে বাঁচান।

রতন তালুকদার ঃ সম্পাদক , সাপ্তাহিক জন্মভ‚মি , নিউইর্য়ক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here