ইরানে যে কোনো মুহূর্তে হামলা

0
9

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ড্রপ সাইট নিউজ রবিবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সোমবার ইরানে হামলা শুরু করতে পারে বলে একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়ে দেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহেই ইরানে হামলার অনুমোদন দিতে পারেন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশঙ্কায় ৮২ মেট্রো স্টেশন এবং ৩০০ পার্ককে আশ্রয়কেন্দ্র ঘোষণা করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার মধ্যে তেহরানে যুদ্ধের ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে শহরজুড়ে মেট্রো স্টেশন, পার্কিং এলাকা ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনাকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির সংকট ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ।

ওয়াশিংটন ও তেহরানের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মাঝে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে তা আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। ইরানের আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মাঝে ওই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা। রবিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে এই তথ্য জানানো হয়েছে। খবর বিবিসি, আলজাজিরা ও ইরনার।
আরব সরকারগুলোর পরামর্শক হিসেবে কাজ করা সাবেক এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা পারমাণবিক অস্ত্র বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পর্কে নয়। এটি মূলত শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি ড্রপ সাইট নিউজকে বলেন, মার্কিন যুদ্ধ পরিকল্পনাকারীরা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ব্যালিস্টিক এবং অন্যান্য সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে আক্রমণের পরিকল্পনা করছে। তবে এর লক্ষ্য হলো ইরানের সরকার, বিশেষ করে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নেতৃত্ব এবং সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়া। আইআরজিসি হলো ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর একটি শাখা যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর তৈরি হয়েছিল এবং যার নেতৃত্ব এখন দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

সূত্র জানায়, ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা ইরানি নেতৃত্বের ওপর হামলা সফল হলে প্রতিবাদকারীরা রাস্তায় নেমে আসবে। ফলে সরকার উৎখাত হবে। সাবেক ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও বলেন, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ইরানে মার্কিন হামলার অপেক্ষায় আছেন। ট্রাম্পকে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে, ইরানে পশ্চিমাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ একটি নতুন সরকার গঠনে ইসরাইল সহায়তা করতে পারবে। দুজন জ্যেষ্ঠ আরব গোয়েন্দা কর্মকর্তা ড্রপ সাইটকে জানিয়েছেন, তারা খবর পেয়েছেন যে, যে কোনো মুহূর্তে ইরানে মার্কিন হামলা হতে পারে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ এড়াতে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক দেশগুলো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধান এগিয়ে নেওয়ার জন্য তুর্কি নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছেন।
এদিকে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান আলী লারিজানি জানিয়েছেন, উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেও একটি আলোচনার কাঠামো তৈরির কাজ এগিয়ে চলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লারিজানি বলেন, কৃত্রিম মিডিয়া যুদ্ধের ডামাডোলের বাইরেও আলোচনার একটি কাঠামো গঠনের কাজ এগোচ্ছে। তবে এই কাঠামো বা আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। এদিকে শনিবার এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্পের কাছে সাংবাদিকরা জানতে চান, ইরান নিয়ে তার সবশেষ চিন্তাভাবনা কী। শুরুতে কোনো জবাব না দিতে চাইলেও পরে তিনি বলেন, আমরা ওই অঞ্চলে ব্যাপক সামরিক সম্পদ জোরদার করেছি। আশা করি তারা (তেহরান) এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবে যা গ্রহণযোগ্য।

পারমাণবিক চুক্তিতে রাজি না হলে কিংবা বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ না করলে ইরানে বারবার হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে আসছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই হস্তক্ষেপের হুমকির পর মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের নৌ উপস্থিতি জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, ট্রাম্প নিয়মিতই বলেন যে তিনি রণতরী এনেছেন। এসব দেখে ইরানি জাতি ভয় পায় না। ইরানি জনগণ এসব হুমকিতে বিচলিত হবে না। তিনি বলেন, আমরা হামলার সূচনাকারী নই এবং কোনো দেশকে আক্রমণ করতে চাই না। তবে যে কেউ আক্রমণ কিংবা হয়রানি করলে ইরানি জাতি তার বিরুদ্ধে শক্ত আঘাত হানবে। তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনায় কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা এখনো রয়েছে বলে জানিয়েছে তেহরান। দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা এমন ন্যায্য আলোচনার জন্য প্রস্তুত। যা তাদের প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা খর্ব করার উদ্দেশ্যে নয়।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ছয়টি ডেস্ট্রয়ার, একটি বিমানবাহী রণতরী এবং তিনটি লিটোরাল কমব্যাট জাহাজ মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। ১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটির জন্য সবচেয়ে তীব্র রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে হিসেবে হাজির হয় এই বিক্ষোভ। তবে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক দমন-পীড়ন চালিয়ে ওই বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে এনেছে। দেশটির সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ-সহিংসতায় ইরানের বিভিন্ন প্রান্তে ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ বলেছে, এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৭১৩ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
এদিকে রবিবার গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপাকালে তেহরান সংকট ব্যবস্থাপনা সংস্থার প্রধান আলী নাসিরি বলেন, তেহরান সিটি কর্পোরেশনের প্যাসিভ ডিফেন্স কমিটি রাজধানীর বিদ্যমান আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর ওপর একটি বিস্তৃত জরিপ চালিয়েছে। এতে দেখা গেছে, তেহরানের বিভিন্ন স্কুলে থাকা প্রায় ৫১৮টি পুরোনো আশ্রয়কেন্দ্র শনাক্ত করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ বর্তমানে সংস্কার ও ব্যবহারের উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। আলী নাসিরি বলেন, তেহরানের ৮২টি মেট্রো স্টেশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব স্থানে বিশ্রামাগার, পানি, খাদ্য মজুতসহ প্রয়োজনীয় সুবিধা স্থাপন করা হচ্ছে। এই স্টেশনগুলোতে আশ্রয়কেন্দ্র নির্দেশক সাইনবোর্ড ও লেবেল  স্থাপনের কাজ শীঘ্রই সম্পন্ন হবে।

তিনি আরও বলেন, মেট্রো এলাকার বাইরে থাকা পার্কিং লট এবং পাবলিক কমপ্লেক্সের মতো ৩০০ টির বেশি ভূগর্ভস্থ স্থানকেও সম্ভাব্য জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন ও ওয়াশিংটনের ক্রমাগত হামলার হুমকির মধ্যে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান আলী লারিজানি জানিয়েছেন, উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেও একটি আলোচনার কাঠামো তৈরির কাজ এগিয়ে চলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লারিজানি বলেন, কৃত্রিম মিডিয়া যুদ্ধের ডামাডোলের বাইরেও আলোচনার একটি কাঠামো গঠনের কাজ এগোচ্ছে। তবে এই কাঠামো বা আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। এদিকে ইউরোপীয় সেনাবাহিনীকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ঘোষণা করেছে ইরান।
তেহরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে সরকারের দমন-পীড়নের জন্য ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসকেও (আইআরজিসি) একই উপাধি দিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন। রবিবার পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণার বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে আইনের ৭ অনুচ্ছেদের অধীনে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয়রা আসলে নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছে এবং আবারও মার্কিনিদের অন্ধ আনুগত্যের মাধ্যমে, তাদের নিজস্ব জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজধানী তেহরানের বাসিন্দা ৪৩ বছর বয়সী মিলাদ (ছদ্মনাম), পেশায় প্রকৌশলী। তিনি সংবাদমাধ্যম মিডেল ইস্ট আইকে বলেছেন, আমি হামলার জন্য অপেক্ষা করেছি। সকাল হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি ঘুমাতে পারিনি।

আমি জেগে ছিলাম এবং বিস্ফোরণের শব্দ শুনব ভাবছিলাম। কিন্তু হয়নি। দেখা যাক আজ রাতে কি হয়। সোহরেহ নামে ৬৮ বছর বয়সী এক নারী জানিয়েছেন তিনি প্রতিদিন সকালে পূর্ব তেহরানে বাড়ির কাছে একটি পার্কে যান। রবিবার সকালে পার্কে যাওয়ার পর তার সঙ্গীরা জানান, রবিবার রাতে নাকি যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাতে পারে। হামলার শঙ্কায় এ নারী বলেছেন, তিনি বিদেশিদের হামলার বিরুদ্ধে। কিন্তু অন্য অনেকে এ হামলার জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, তারা মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা চালায় তাহলে সব ঠিক হয়ে যাবে। সরকার বিক্ষোভকারীদের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। তারা জানেন না, কি তাদের পক্ষে যাবে আর কি তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র হামলার প্রস্তুতি নেওয়ায় ইরানের সাধারণ মানুষের কাছে এখন যুদ্ধ যেন সামনাসামনি চলে এসেছে। তাদের কানে বাজছে যুদ্ধের দামামা। আরজু নামে ৩২ বছর বয়সী এক সরকারি চাকরিজীবী জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে নীরব আতঙ্ক কাজ করছে। কেউই যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে কথা বলছেন না। কিন্তু সবার মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে ভয় আছে। কারণ গত বছর ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে তারা দেখেছিলেন যুদ্ধের বীভৎসতা। সবাই অপেক্ষা করছেন কখন প্রথম বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here