লিবিয়ার দীর্ঘকালীন শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির সবচেয়ে প্রভাবশালী উত্তরসূরি সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি এক সশস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানী ত্রিপোলি থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত জিনতান শহরে ৫৩ বছর বয়সী সাইফকে চার বন্দুকধারী তাঁর নিজ বাসভবনের বাগানে গুলি করে হত্যা করে।
গাদ্দাফি পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে সৌদি সংবাদমাধ্যম আল-আরাবিয়া জানিয়েছে, হামলাকারীরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরাগুলো অকেজো করে ভেতরে প্রবেশ করে। সাইফ আল-ইসলামের মুখোমুখি হয়ে তারা সরাসরি গুলি বর্ষণ করে এবং দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। তাঁর রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ওসমান ফেসবুকে এই ‘হত্যাকাণ্ডের’ খবর নিশ্চিত করে শোক প্রকাশ করেছেন।
ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে সংস্কারের স্বপ্ন বাবা মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসনামলে সাইফ ছিলেন দেশটির অঘোষিত দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে পড়াশোনা করা সাইফ ইংরেজিতে ছিলেন সাবলীল। লিবিয়াকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে দশা থেকে মুক্ত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। বিশেষ করে লকার্বি বিমান হামলার ক্ষতিপূরণ এবং লিবিয়ার গণবিধ্বংসী অস্ত্র ত্যাগের আলোচনায় তিনি নেতৃত্ব দেন। অনেক পশ্চিমা দেশ তাঁকে লিবিয়ার আধুনিক ও সংস্কারক মুখ হিসেবে বিবেচনা করত।
বিদ্রোহ, পতন ও বন্দিজীবন ২০১১ সালে যখন লিবিয়ায় বিদ্রোহ শুরু হয়, সাইফ তাঁর পশ্চিমা বন্ধুদের বদলে পরিবারের প্রতি আনুগত্য বেছে নেন। বিদ্রোহীদের দমনে কঠোর অবস্থান নিয়ে তিনি ব্যাপক সমালোচিত হন। বাবার মৃত্যুর এক মাস পর নাইজারে পালানোর পথে তিনি বিদ্রোহীদের হাতে ধরা পড়েন এবং দীর্ঘ ছয় বছর জিনতানের একটি পাহাড়ি শহরে বন্দি থাকেন। ২০১৫ সালে ত্রিপোলির একটি আদালত যুদ্ধাপরাধের দায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও ২০১৭ সালে সাধারণ ক্ষমার আওতায় তিনি মুক্তি পান।
রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ব্যর্থ চেষ্টা দীর্ঘ অজ্ঞাতবাস কাটিয়ে ২০২১ সালে সাইফ আল-ইসলাম নাটকীয়ভাবে লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন। ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে মনোনয়নপত্র জমা দিতে গিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলেছিলেন। তবে তাঁর প্রার্থিতা লিবিয়ার রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতা তৈরি করে। তাঁর বিরোধীরা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এই প্রার্থিতা প্রত্যাখ্যান করে। আইনি জটিলতা ও দণ্ডাদেশের কারণে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন প্রক্রিয়াটিই ভেস্তে যায় এবং লিবিয়া রাজনৈতিক অচলাবস্থায় ফিরে যায়।
সাইফ আল-ইসলামের এই করুণ মৃত্যু লিবিয়ার ইতিহাসে গাদ্দাফি যুগের প্রভাবের সর্বশেষ শক্তিশালী অধ্যায়েরও অবসান ঘটাল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।




