হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বন্ধের মেয়াদ আরও বাড়িয়েছে কাতার এনার্জি। এতে কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় তুলনামূলক কম দামে পাওয়া এই গ্যাসের সরবরাহ বন্ধ থাকলে ঘাটতি পূরণে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে বাংলাদেশকে। কিন্তু স্পট মার্কেট থেকে কার্গো পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। উচ্চ দামেও কার্গো পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এসব কারণে চলমান গ্যাস সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির অন্যতম প্রধান উৎস কাতার। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার এনার্জি থেকে এলএনজি আমদানি করা হয়। ওমানের সঙ্গেও রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি। এই চুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তুলনামূলক স্থিতিশীল দামে দীর্ঘ সময় গ্যাস পাওয়া যায়। স্পট মার্কেটের মতো প্রতিদিন দামের বড় ওঠানামার ঝুঁকি এ ক্ষেত্রে কম।
কিন্তু হরমুজ প্রণালি ঘিরে অস্থিরতায় সেই সরবরাহ ব্যবস্থাই এখন বড় অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। এলএনজি বহনকারী জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ পথ। কাতারের এলএনজি রপ্তানির বড় অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলে কাতার থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সরবরাহ ব্যাহত হয়।
চলতি বছরের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মধ্যে এলএনজি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কাতার সরবরাহ বন্ধ রাখে। জুলাইয়ে কাতার থেকে একটি কার্গো বাংলাদেশে এলেও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। সর্বশেষ অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে কাতারের সরবরাহের মেয়াদ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তাই আপাতত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে নিয়মিত কার্গো পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) ও অপারেশনের চলতি দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী শোয়েব আহমেদ বলেন, কাতার এনার্জির কাছ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো চিঠি পায়নি পেট্রোবাংলা। এর আগেও ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতার কারণে কাতার অনিবার্য পরিস্থিতির কথা জানিয়ে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রেখেছিল। তিনি বলেন, আবারও এমন পরিস্থিতি হলে আপাতত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা ছাড়া তেমন বিকল্প নেই।
স্পট মার্কেটে কার্গো নিয়ে সংকট
কাতারের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ অনিশ্চিত হওয়ার মধ্যে ঘাটতি পূরণে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু সেখানেও কার্গো পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সরবরাহের জন্য এলএনজি কিনতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও ৮-৯ সেপ্টেম্বর সরবরাহের একটি কার্গোর জন্য কোনো সরবরাহকারী প্রস্তাব দেয়নি। একইভাবে ১-২ অক্টোবর সরবরাহের জন্য আহ্বান করা কার্গোর বিষয়ে কোনো প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে ২৫-২৬ সেপ্টেম্বর এবং ৫-৬ অক্টোবর সরবরাহের জন্য দুটি কার্গোর প্রস্তাব পাওয়া গেলেও দাম চাওয়া হয় অস্বাভাবিক বেশি দাম। প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম চাওয়া হয় ২৫ দশমিক ৯২ ডলার।
এ পরিপ্রেক্ষিতে চারটি কার্গোর জন্য আবারও দর প্রস্তাব চেয়েছে পেট্রোবাংলা। গত সোমবার জারি করা এক নোটিশে ৩০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে চারটি কার্গোর জন্য মূল্য প্রস্তাব দিতে বলা হয়েছে। নোটিশ অনুযায়ী, ৮-৯ সেপ্টেম্বর, ২৫-২৬ সেপ্টেম্বর, ১-২ অক্টোবর এবং ৫-৬ অক্টোবর সরবরাহের জন্য এসব কার্গো কেনা হবে। প্রতিটি কার্গোর দর প্রস্তাব জমা দেওয়ার শেষ সময় আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১০টা ৩৬ মিনিটের মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাব দিতে হবে এলএনজি স্পট পারচেজ সফটওয়্যারের মাধ্যমে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, সেপ্টেম্বর মাসে জাপান-কোরিয়া মার্কার (জেকেএম) সূচকে এলএনজির দাম রয়েছে প্রতি ইউনিট ২২ দশমিক ৯৫ থেকে ২৩ দশমিক ৫০ ডলারের মধ্যে। এর চেয়ে প্রায় ২ থেকে ৩ ডলার বেশি দামে কার্গো কেনা হলে সরকারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হবে। খুব অল্প সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে কিছুটা বেশি দাম স্বাভাবিক হলেও এত বড় ব্যবধানকে অস্বাভাবিক মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতি মাসে ১০টি এলএনজি কার্গোর মধ্যে সাত থেকে আটটি স্পট মার্কেট থেকে কিনতে হচ্ছে। স্পট মার্কেটে প্রতি কার্গোর জন্য ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। বিপরীতে ওই গ্যাস বিক্রি করে সরকার পায় প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি কার্গোতে লোকসান হচ্ছে ৭০০ কোটি টাকার বেশি। এ হিসাবে প্রতি মাসে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতেই সরকারের বাড়তি লোকসান দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা।
এরই মধ্যে আগস্টের এলএনজি আমদানির জন্য পেট্রোবাংলাকে ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। সেপ্টেম্বরের জন্যও বড় অঙ্কের ভর্তুকি প্রয়োজন হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি থাকলে চলতি বছরে এলএনজি আমদানিতে সরকারের লোকসান আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দুই মাস ধরে গ্যাস সংকট
দেশে প্রায় দুই মাস ধরে গ্যাস সংকট চলছে। দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি জুলাই-আগস্ট মাসে দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় সংকট আরও তীব্র হয়। পরে টার্মিনাল চালু হলেও কার্গো নিয়ে নানা জটিলতা দেখা দেয়। একই সময়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও ধারাবাহিকভাবে কমছে।
গতকাল রাত ৮টার তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৩২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস ১৬১ কোটি ৯০ লাখ ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি বা আরএলএনজি ৭০ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট। অথচ দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট।
বর্তমানে দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে দৈনিক ৭০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস সরবরাহ করা হলেও টার্মিনাল দুটির সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ সক্ষমতা অনুযায়ী সরবরাহ করা গেলেও জাতীয় গ্যাস ব্যবস্থায় বড় ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
শিল্পে বাড়ছে উৎকণ্ঠা
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে শিল্পে। গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ বা ছুটি ঘোষণা করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনাও ঘটছে।
কাতারের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়া এবং স্পট মার্কেট থেকেও প্রয়োজনীয় সময়ে কার্গো পাওয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ায় শিল্পে সংকট আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। সামনে এলএনজি সরবরাহে বড় কোনো স্বস্তি না এলে গ্যাসনির্ভর শিল্পে উৎপাদন আরও কমে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন করে কারখানা বন্ধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সংকটে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের চাপ কম। ২০ আগস্টের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। শিল্প পুলিশ এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের অভাবে এরই মধ্যে দুটি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে। আরও পাঁচটি কারখানার গ্যাসনির্ভর ইউনিট বন্ধ রয়েছে। শিল্পাঞ্চলের প্রধান কারখানাগুলোর উৎপাদন গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।
ভালুকায় ছোট-বড় দুই শতাধিক কারখানার মধ্যে ৯৯টি গ্যাসনির্ভর। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং ও সিরামিক শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাসনির্ভর কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের ধাপে ধাপে ছুটিও দেওয়া হচ্ছে। শিল্প পুলিশ বলছে, সংকট দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে।
তিতাস গ্যাসের ভালুকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সংকটের সময়ে শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ ৩০ থেকে ৫০ পিএসআইয়ে নেমে আসে। কখনও ৬০ থেকে ৯০ পিএসআই পর্যন্ত উঠলেও স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য তা পর্যাপ্ত নয়। তাই গ্যাস সংকটের প্রভাব এখন শুধু উৎপাদন কমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; কারখানা বন্ধ ও কর্মসংস্থান ঝুঁকির আশঙ্কাও বাড়ছে।