ঢাকার ধামরাইয়ের কালামপুর গ্রামের লিটন মিয়া। বৃহস্পতিবার সকালে বের হয়েছিলেন ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে। সঙ্গে নিয়েছিলেন ২২০০ টাকা। কিন্তু কয়েক দোকান ঘুরেও সিলিন্ডার কিনতে পারেননি। হতাশ হয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয় তাঁকে।
লিটন মিয়া আক্ষেপ করে সমকালকে বলেন, ‘১ হাজার ৫৮৫ টাকার সিলিন্ডার কিনতে ২২০০ টাকা নিয়ে বের হয়েছিলাম। সাত দোকান ঘুরেও সিলিন্ডার পাইনি। সব দোকানদারই বলছেন, সরবরাহ নেই। এখন রান্নার চুলা জ্বালাব কীভাবে।’
লিটন মিয়া কিনতে না পারলেও তাঁর গ্রামের বাসিন্দা আনিছুর রহমান আগের দিন সিলিন্ডার কিনেছেন। এ জন্য তাঁকে বাড়তি টাকা দিতে হয়েছে। আনিছুর বলেন, ‘আমি বুধবার পাঁচ দোকান ঘুরে ২ হাজার ৩৫০ টাকায় সিলিন্ডার কিনেছি। তবে দোকানদার অতিরিক্ত দামে বিক্রির কথা কাউকে বলতে নিষেধ করেছেন।’
শুধু ধামরাই নয়, দেশের কমপক্ষে ১৩ জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও বেশি দামেও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল মামুন জানান, বেশি দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগে দুই দিনে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে দুই লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এই অভিযান চলবে।
অপারেটরদের দাবি, দেশে এলপিজির আমদানি ও মজুত স্বাভাবিক। কিন্তু কিনতে গেলে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। এমন অবস্থা সৃষ্টির পেছনে কৃত্রিম সংকটের মতো বিষয় আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে বলেছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে এক অনলাইন সভায় তিনি এ নির্দেশ দেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারি করতে হবে।
সরকারি হিসাবে, আগস্টে দেশে প্রায় এক লাখ ৫৭ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় এক লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। এরপরও রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকার বাজারে সিলিন্ডার নিয়ে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা।
দেশে বছরে এলপিজির চাহিদা ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন। প্রায় এক কোটি গ্রাহক এ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। চাহিদার ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় বাসাবাড়ির রান্নায়। তাই বাজারে সিলিন্ডারের সরবরাহ ও দামের এই অস্বাভাবিকতায় সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
কয়েক কোম্পানির হাতে বাজারের বড় অংশ
দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক হলেও নিয়মিত আমদানি করে হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি। বাজারের বড় অংশ রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে।
ওমেরা পেট্রোলিয়ামের বাজার হিস্যা ১৯ শতাংশ, পেট্রোম্যাক্সের ১৭, মেঘনা গ্রুপের ১৬ এবং যমুনা স্পেসটেকের ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ এ চার কোম্পানি প্রায় ৬৮ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। বিএম এনার্জির হিস্যা ৮ শতাংশ, ইউনাইটেড আইগ্যাসের ৭ এবং ডেল্টার ৪ শতাংশ।
সেপ্টেম্বরের আমদানিতেও বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য দেখা গেছে। গত শনিবার পর্যন্ত ইউনাইটেড আইগ্যাস ২৩ হাজার ৪৩২ টন, যমুনা স্পেসটেক ২০ হাজার ৬০২, বিএম এনার্জি ১৮ হাজার ২৫২, ওমেরা পেট্রোলিয়াম ১৪ হাজার ৩০১, মেঘনার ফ্রেশ ১৩ হাজার ৪০১ এবং পেট্রোম্যাক্স ১০ হাজার ৬০০ টন এলপিজি আমদানি করেছে। সান গ্যাস আমদানি করেছে আট হাজার ৪০০, এসকেএস চার হাজার এক, টিএমএসএস তিন হাজার ৩০০ এবং প্রিমিয়াম এলপি গ্যাস দুই হাজার ৪৫০ টন।
দেশজুড়ে বেশি দামে সিলিন্ডার
রাজধানীতেও নির্ধারিত দামে পাওয়া যাচ্ছে না এলপিজি সিলিন্ডার। সেপ্টেম্বরে সরকার ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করলেও বিভিন্ন এলাকায় তা দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।
রাজধানীর বাইরে এলপিজির বাড়তি দামের চিত্র আরও স্পষ্ট। কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়ে কিনতে হচ্ছে। সিরাজগঞ্জে বাড়তি দামে সিলিন্ডার বিক্রির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্দেশে এই অভিযান শুরু হয়। বুধবার একটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। জেলার তাড়াশ উপজেলা সদরের কৃষিজীবী নিয়াজ আহমেদ বলেন, বুধবার তাড়াশ পৌর বাজার থেকে তিনি ১২ কেজির ফ্রেশ সিলিন্ডার গ্যাস কিনেছেন ২ হাজার ৩০০ টাকায়।
বেলকুচি উপজেলার সমেশপুর বাজারে যমুনা তেল কোম্পানির ডিলার ইসমাইল হোসেনের মালিকানাধীন সাথী এন্টারপ্রাইজের দোকানে ১২ কেজি এলপিজি গ্যাসের বিক্রয়মূল্য ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারিত উল্লেখ করে তালিকা টানানো রয়েছে। তবে কিনতে গেলে ২১৫ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া উপজেলা সদরের মুকুন্দগাতী বাজারের শতরুপা স্টোরের মালিক হাবিবুর রহমান হাবিব হোসেন স্থানীয় পাইকারি বিক্রেতাদের কাছে ১২ কেজি এলপিজি গ্যাস ২১৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি করছেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
রাজবাড়ীতে বিভিন্ন দোকান ঘুরে অনেক সময় সিলিন্ডার পাচ্ছেন না ক্রেতারা। পাওয়া গেলেও ১২ কেজির সিলিন্ডারের জন্য দিতে হচ্ছে এক হাজার ৮০০ থেকে এক হাজার ৯০০ টাকা। কয়েকটি কোম্পানির সরবরাহ না থাকায় অন্য কোম্পানির ওপর চাপ বেড়েছে।
কুড়িগ্রামে প্রায় এক মাস ধরে ওমেরা, বসুন্ধরা ও যমুনা ব্র্যান্ডের গ্যাসের সরবরাহ নেই বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তাদের হিসাবে, প্রতিটি কোম্পানি মাসে গড়ে সাত থেকে আট হাজার সিলিন্ডার প্রয়োজন। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় মজুত থাকা সিলিন্ডারও বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।
মৌলভীবাজারে সংকটের পাশাপাশি বাড়তি দাম নেওয়া হচ্ছে। জেলার ডিস্ট্রিবিউটরদের অধিকাংশই কম সরবরাহ পাচ্ছে। বাজারে ওরিয়ন ও টোটাল গ্যাসের সংকট রয়েছে। আইগ্যাস, পেট্রোম্যাক্স, ওমেরা ও ফ্রেশের ১২ কেজির সিলিন্ডার খুচরায় এক হাজার ৯৫০ থেকে দুই হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। কোনো কোনো কোম্পানির সিলিন্ডারের দাম উঠেছে দুই হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত।
নওগাঁর রাণীনগরেও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো কোম্পানির সিলিন্ডার এক মাস ধরে না আসায় স্থানীয় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে। লালমনিরহাটে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা দামের সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৬২০ থেকে ১ হাজার ৬৭০ টাকায়। এ ছাড়া নরসিংদী, খুলনা, বরগুনা, নাটোর, দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও লালমনিরহাটেও প্রায় একই রকম চিত্র পাওয়া গেছে।
এক পক্ষের দায় অন্য পক্ষের ঘাড়ে
বাড়তি দামের কারণ নিয়ে অপারেটর, ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলারদের মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটরদের অভিযোগ, অপারেটররা চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার দিচ্ছেন না। আমদানি ও মজুত থাকার পরও প্ল্যান্ট থেকে সরবরাহ সীমিত করা হচ্ছে। এতে ডিস্ট্রিবিউটররা প্রয়োজনীয় পণ্য পাচ্ছেন না, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।
সিলেটের এক ডিস্ট্রিবিউটরের অভিযোগ, কোম্পানির কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সরবরাহ মিলছে না। এমনকি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কোম্পানির কাছ থেকে পণ্য কিনতে হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, ডিলারদের বেশি দামে বিক্রি না করে উপায় নেই। কারণ তারা অপারেটরের কাছ থেকে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনছেন।
অপারেটরদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, আমদানি কমেনি; দেশে পর্যাপ্ত এলপিজি এসেছে। সরবরাহ কমার সুযোগ নিয়ে ডিস্ট্রিবিউটর, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের একাংশ সিলিন্ডার মজুত করে বাড়তি দামে বিক্রি করছে।
বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেছেন, আমদানি কমেনি। খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতাদের কারণে সমস্যা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। কোনো অপারেটর বেশি দামে বিক্রি করছে– এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
আন্তর্জাতিক বাজারেও চাপ
এলপিজির মূল উপাদান প্রোপেন ও বিউটেন আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম ও জাহাজ ভাড়া বাড়লে দেশের বাজারে এর প্রভাব পড়ে। ব্যবসায়ীদের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটার কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। অনেক আমদানিকারক চুক্তির পরিমাণের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম কার্গো পাচ্ছেন। নতুন কার্গো সংগ্রহেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিইআরসি মূল্য নির্ধারণের সময় টনপ্রতি ১৬০ ডলার প্রিমিয়াম ধরে হিসাব করলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তা এখন ২৬০ থেকে ৪০০ ডলারে উঠেছে বলে ব্যবসায়ীদের দাবি। এতে নির্ধারিত দামে বিক্রি করে বাড়তি আমদানি ব্যয় সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান আমদানি কমিয়েছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগস্টে ১৩টি প্রতিষ্ঠান এলপিজি আমদানি করলেও সেপ্টেম্বরে আমদানি করেছে ৯টি প্রতিষ্ঠান।
পাঁচ বছরে নির্ধারিত দাম প্রায় দ্বিগুণ
২০২১ সালের এপ্রিলে বিইআরসি প্রথমবার বেসরকারি এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। তখন ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ৯৭৫ টাকা। ২০২৬ সালের এপ্রিলে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৪০ টাকা। পাঁচ বছরে দাম বেড়েছে ৯৬৫ টাকা বা প্রায় ৯৯ শতাংশ।
চলতি বছরেও দামে বড় ওঠানামা হয়েছে। এপ্রিলে দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা বেড়ে দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৪০ টাকা। পরে জুনে ৫৫ টাকা ও জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা কমানো হয়। আগস্টে আবার ৭০ টাকা বাড়িয়ে দাম করা হয় ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। সেপ্টেম্বরে আরও ১৩ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।
নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, বিইআরসির নির্ধারিত দামে কোথাও এলপিজি বিক্রি হচ্ছে না। এতে ভোক্তাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এলপিজি খাতের অনিয়ম ঠেকাতে বিইআরসি, প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
শামসুল আলমের মতে, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল এবং আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে নতুন করে লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করা যেতে পারে।
বুধবার জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে অনলাইন সভায় জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখে তথ্যপ্রমাণসহ প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, কৃত্রিম সংকট বা বিইআরসি নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বৃহস্পতিবার লোয়াবও অপারেটর, ডিস্ট্রিবিউটর, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রির নির্দেশ দিয়েছে।