সাইবার অপরাধ দমনের নামে সরকারের সমালোচনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রাখা হলে তা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠবে। কোনো ব্যক্তির অপরাধে সংবাদমাধ্যম বন্ধ, সন্দেহের ভিত্তিতে প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম জব্দ এবং সাংবাদিকদের বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা দেওয়ার মতো বিধান অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করবে। একই সঙ্গে অপতথ্য নিয়ন্ত্রণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু কঠোর আইন করেও সুফল পাওয়া যাবে না। প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব উদ্বেগ জানিয়ে আইনটির নিবর্তনমূলক ধারা বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
আজ রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। টিআইবি, ব্র্যাক, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ ১৯টি সংগঠনের আয়োজন করে।
সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইন প্রয়োজন, তবে সরকারের সমালোচনা ও অপরাধকে এক করে দেখা যাবে না। গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের সমালোচনা হবেই। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়—এ কথা বিবেচনায় রেখেই আইন প্রণয়ন করা উচিত।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘দয়া করে আমাদের হাতটা আবার বাঁধবেন না। হাত বেঁধে দিলে আপনার ক্ষতি হবে। আপনার জন্য কিন্তু আমি আর লিখতে পারব না। আপনাকে একদিন আমাদের কাছে আবার আসতে হবে।’
প্রস্তাবিত আইনে কোনো ব্যক্তির অপরাধের কারণে পুরো সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার সুযোগ এবং সাংবাদিকদের বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা দেওয়ার বিরোধিতা করেন তিনি। তার আশঙ্কা, আইনের প্রয়োগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হলে স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতাসীন নেতার ফোনেও কাউকে গ্রেপ্তারের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। কোনো সংবাদ কারও অপছন্দ হলেই সেটিকে ভুল তথ্য বা মানহানিকর বলে দাবি করার ঝুঁকিও রয়েছে। তাই, ইচ্ছাকৃত ভুল তথ্যের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং আইন প্রণয়নের আগে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জবাবদিহি জরুরি
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মুনাফাকেন্দ্রিক অ্যালগরিদম ও প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে শুধু কঠোর আইন করে অপতথ্য নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তার অভিযোগ, ব্যবসায়িক স্বার্থে মেটা সংঘাত ও সহিংসতামূলক বক্তব্য বেশি প্রচার করে, অথচ ধর্মনিরপেক্ষ ও যৌক্তিক আলোচনাকে সেন্সর করে। এসব প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে সাধারণ নাগরিকদের ওপর আইন চাপিয়ে দেওয়া টেকসই সমাধান নয়।
তিনি সতর্ক করে বলেন, অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে বর্তমান কাঠামোয় আইন পাস করা হলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি সরকারের জন্যও বুমেরাং হতে পারে। অপতথ্য ঠেকানোর নামে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়।
ডেইলি ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, রামুতে বৌদ্ধপল্লিতে হামলা, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের গণহত্যায় উসকানি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সংঘবদ্ধ হামলার মতো ঘটনায় প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার দেখা গেছে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সমন্বয়ের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ কঠিন হচ্ছে।
প্রস্তাবিত আইনের ২৬(ক) ধারা বাদ দেওয়া, ২৫ ধারায় মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য না করা, ৮(৩) ধারার অপব্যবহার রোধ এবং সাংবাদিকদের বিচারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা বাতিলের দাবি জানান তিনি। মানহানির ক্ষেত্রে ফৌজদারি ব্যবস্থার পরিবর্তে দেওয়ানি আইনে ক্ষতিপূরণ ও বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখার পরামর্শও দেন।
শফিকুল আলম আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সার ও ইউটিউবারদের মাধ্যমে চরিত্রহনন এবং লাগামহীন অপপ্রচার থেকে সুরক্ষার উপায় বের করতে হবে।
তদন্ত কর্মকর্তার ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, প্রস্তাবিত আইনে তদন্ত কর্মকর্তাদের শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে গণমাধ্যমের ডেটা সেন্টারসহ প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম জব্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এতে একটি পুরো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আইনে মানহানির সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকাও উদ্বেগজনক। গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়নে তৃণমূল পর্যায়ের সংবাদকর্মীদের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক ও প্রকাশক শরীফুজ্জামান পিন্টু প্রস্তাবিত আইনের দায়মুক্তির বিধান, অপরাধের অস্পষ্ট সংজ্ঞা এবং অনলাইন কনটেন্ট ব্লকের প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানান। সাংবাদিকতা ও মূলধারার গণমাধ্যম যাতে আইনের অপপ্রয়োগের শিকার না হয়, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা দাবি করেন তিনি।
জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের গঠনকাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শরীফুজ্জামান পিন্টু। তার মতে, প্রস্তাবিত কাঠামোয় নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব নেই। কাউন্সিলের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সদস্য হিসেবে মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।
বৈঠকে বক্তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের সুরক্ষায় নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দেন। তাদের দাবি, সাইবার অপরাধ মোকাবিলার পাশাপাশি আইনের অপপ্রয়োগ ঠেকানোর কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।