আগামী কয়েক মাসে বিশ্বজুড়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। ২০২৭ সালজুড়েও এর প্রভাব অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। যুদ্ধের কারণে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন এবং এল নিনোর প্রভাবে খরার কারণে শস্যের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং অন্যান্য আরও বেশ কিছু কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ায় বৃষ্টিপাত দেরিতে শুরু হওয়ার পূর্বাভাসের মধ্যেই চালের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। মিসরে রুটির দাম বেড়েছে এক-চতুর্থাংশ, আর এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় ভারতে চিনির দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেন, ‘এসব কারণে পুরো ব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বছরের শেষ দিকে, আগামী বছরের শুরুতে এবং সম্ভবত পুরো আগামী বছরজুড়েই এর প্রভাব আরও বেশি দেখা যাবে।’
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের গতকাল সোমবারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে। এসব অঞ্চলের পরিবারগুলোর মোট ব্যয়ের বড় অংশই যায় খাবারের পেছনে। ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিশ্বের দরিদ্রতম ভোক্তারা। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির বিশ্লেষণ করা ১৫০টি দেশের মধ্যে ২২ শতাংশ দেশে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে গেছে। আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল ১৪ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক বাজারে কেনাবেচা হওয়া বিভিন্ন পণ্যের মাসিক মূল্য পরিবর্তন পরিমাপ করে এফএওর খাদ্য মূল্য সূচক। সেপ্টেম্বরে এ সূচকের গড় ছিল ১৩৬ পয়েন্ট, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ। খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী দেশগুলো রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে। এতে খাদ্যপণ্যের সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সরবরাহে একাধিক ধাক্কা
কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে শস্য পরিবহনের অবকাঠামোয় হামলার কারণে গমের চালান ব্যাহত হচ্ছে। এতে বড় আমদানিকারক দেশ মিসর ও ইন্দোনেশিয়াকে বিকল্প উৎস থেকে গম সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, লোহিত সাগরে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে জাহাজগুলো আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথে চলাচল করছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার রপ্তানিও ব্যাহত হচ্ছে। এতে কৃষিকাজের ব্যয় বাড়ছে। একই সময়ে এল নিনোর প্রভাবে শুষ্ক আবহাওয়া ভারতে ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফসলের উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। ২০২৬ সালে গমের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোতে বড় মজুত থাকা সত্ত্বেও চালের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে সারের দাম যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল, সেখান থেকে কিছুটা কমেছে। তবে দাম এখনও বেশি।
নেসলে ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিশ তিওয়ারি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি, এখন বাস্তবতা।’ পণ্যের কাঁচামালের বাড়তি দামসহ বিভিন্ন কারণে ব্যবসায়িক পরিবেশকে ‘চ্যালেঞ্জপূর্ণ’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। মিসরে ভর্তুকিবিহীন বড় আকারের একেকটি রুটির দাম জুলাইয়ে চার মিসরীয় পাউন্ড থেকে বেড়ে এখন প্রায় পাঁচ পাউন্ড হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে রান্নার তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়ায় এ বছর ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ। ভারতে উৎপাদন ঘাটতির কারণে সেপ্টেম্বরে চিনি, পেঁয়াজ ও ডালের দাম আগের মাসের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে যা
২০২৫ সালের শেষ দিক থেকেই খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। এখন স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের বাড়তি দাম ভোক্তাদের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করায় মূল্যস্ফীতি আরও দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার যেসব বড় আমদানিকারক দেশ স্থানীয়ভাবে ভালো ফসল উৎপাদনের পর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছিল, তাদের এখন আবার বিশ্ববাজারে ফিরতে হচ্ছে। এতে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শস্য কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আলেকজান্ডার কারাভায়তসেভ বলেন, ‘কয়েক মাসের মধ্যে আমদানিকারকরা বাজারে ফিরে এলে চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য নতুন ঢেউ তৈরি হতে পারে।’
এফএওর তোরেরো বলেন, বিশ্বজুড়ে শস্যের রেকর্ড মজুত যে সুরক্ষা দিচ্ছিল, তা ক্রমেই কমে আসছে। তিনি বলেন, ‘আগের মৌসুমগুলোর ভালো ফলন ও মজুত এত দিন একটি সুরক্ষাব্যবস্থা হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু সেই সুরক্ষাব্যবস্থার ওপর এখন চাপ বাড়ছে। এর অর্থ, পণ্যের দাম আরও জোরালোভাবে বাড়তে পারে।’ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদি চুক্তিতে কাঁচামাল কেনে। এখন এসব চুক্তি নবায়ন করতে গিয়ে তাদের বেশি দাম দিতে হচ্ছে। স্থানীয় মুদ্রার দর পতনও আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম খাদ্য কোম্পানি পিটি ইন্দোফুডের পরিচালক ফ্রান্সিসকুস ওয়েলিরাং বলেন, ‘পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ইন্দোনেশীয় রুপিয়ায় হিসাব করলে মুদ্রার দর পতনের কারণে এর প্রভাব আরও বেড়ে যায়।’ ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দাম বাড়ার পাশাপাশি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করতেও সমস্যায় পড়ছে।
জাকার্তাভিত্তিক একটি ময়দা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গমের চালান কমে যাওয়ায় ইন্দোনেশিয়ার বেশ কয়েকটি গমকল তাদের উৎপাদনক্ষমতার চেয়ে কম হারে চলছে। গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় ওই কর্মকর্তা নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি।
কে-প্লারের তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় সেপ্টেম্বরে গমের চালান আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪১ শতাংশ কমে চার লাখ ৯১ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে। এ মুহূর্তে সয়াবিন ও ভুট্টার মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এসব পণ্যের সরবরাহ নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আমেরিকার উৎপাদনের ওপর। জ্বালানির দাম বাড়ায় এ দুটি ফসলের চাহিদাও বাড়ছে, কারণ জৈব জ্বালানি উৎপাদনে এগুলোর ব্যবহার বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক শস্য কাউন্সিলের কারাভায়তসেভ বলেন, দক্ষিণ গোলার্ধে গমের ভালো ফলন প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে অস্ট্রেলিয়া ও আর্জেন্টিনার মতো রপ্তানিকারক দেশে উৎপাদন প্রত্যাশার চেয়ে কম হলে তা গমের দাম আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।