রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডে মা-মেয়ে হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি গৃহকর্মী আয়েশাকে স্বামীসহ রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের তৎপরতায় পূর্বের চুরির তথ্য ও একটি মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে ‘ক্লুলেস’ এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা হয়। মোহাম্মদপুর থানার অতীতের বিভিন্ন মামলা ও জিডির তথ্য বিশ্লেষণ করে আয়েশাকে শনাক্ত করা হয়। পরে ম্যানুয়াল সোর্স ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে
গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে অতিরিক্ত কমিশনার এনএস নজরুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
এদিকে মোহাম্মদপুরে মা ও মেয়েকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার গৃহকর্মী আয়েশার ছয় দিন ও তার স্বামী রাব্বি শিকদারকে তিন দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ। গতকাল ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম তাদের রিমান্ডের এ আদেশ দেন। এদিন তাদের আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের ১০ দিন করে রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার এসআই মো. সহিদুল ওসমান মাসুম। রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হারুন-অর-রশিদ রিমান্ড আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন। তবে আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।
এর আগে বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলায় ফুফু শাশুড়ির বাড়ি থেকে আয়েশা ও তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত লায়লা ফিরোজের স্বামী আ জ ম আজিজুল ইসলাম বাদী হয়ে গত ৮ ডিসেম্বর মোহাম্মদপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম জানান, গত ৮ ডিসেম্বর সকাল ৭টা ৫১ মিনিট থেকে ৯টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডে লায়লা আফরোজ (৪৮) ও তার মেয়ে নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিজকে (১৫) ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় ৩ দিন আগে কাজে যোগ দেওয়া গৃহকর্মী ‘আয়েশা’কে সন্দেহভাজন আসামি করে মামলা করেন নিহতের স্বামী আজিজুল ইসলাম (৫৭)। আয়েশাকে সন্দেহ করা হলেও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এই গৃহকর্মীর কোনো ছবি, এনআইডি, মোবাইল নম্বর বা পরিচয় সংরক্ষিত না থাকা। সিসি ক্যামেরার ফুটেজেও তাকে চেনার মতো কোনো স্পষ্ট ভিজ্যুয়াল চিত্র পাওয়া যায়নি। কারণ সে প্রতিবারই বোরকা পরে, মুখ ঢেকে আসা-যাওয়া করত। ঘটনার আশপাশে কোনো ডিজিটাল ক্লু না পেয়ে তদন্ত দল ‘ম্যানুয়াল’ উপায়ে থানায় অভিযোগ আসা গত এক বছরে গৃহকর্মী কর্তৃক সংঘটিত চুরির ঘটনাগুলো খুঁজতে থাকে। তদন্তকারীরা বিশেষভাবে লক্ষ্য করেন গলায় পোড়া দাগ, জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় বাস, গৃহকর্মীর পরিচয়ে সংঘটিত পূর্বের চুরি। এখানে একটি ঘটনায় আয়েশার তথ্য মিলে যায়। মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোডের ভুক্তভোগী একটি পরিবার থেকে পুরনো একটি মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়, যা থেকেই শুরু হয় আসামি চিহ্নিত করার কাজ।
সিডিআরের বিশ্লেষণে পাওয়া অবস্থান ধরে হেমায়েতপুরে গিয়ে জানা যায়, নম্বরটি ব্যবহার করত রাব্বি নামে এক ব্যক্তি। তদন্তে বেরিয়ে আসে রাব্বির স্ত্রী আয়েশা। তারা পূর্বে জেনেভা ক্যাম্পে থাকত। বাদীর দেওয়া বর্ণনার সঙ্গে এটি মিলে যায়। পরবর্তীতে হেমায়েতপুরে অভিযান চালানো হলে তাদের বাসার দরজায় তালা লাগানো পাওয়া যায়। এরপর পরিবারের সদস্যদের তথ্যের ভিত্তিতে আশুলিয়া, বরিশাল, পটুয়াখালীসহ কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। অবশেষে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার চরকায়া গ্রামে দাদা শ্বশুর বাড়ি থেকে আয়েশা ও তার স্বামী রাব্বিকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় আয়েশার কাছ থেকে একটি চুরি করা ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আয়েশা হত্যার দায় স্বীকার করে জানায়, কাজে যোগ দেওয়ার দ্বিতীয় দিন সে ২ হাজার টাকা চুরি করে। তৃতীয় দিন টাকার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের সময় গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে তার তর্কাতর্কি হয়। চতুর্থ দিনে সুইচ গিয়ার চাকু লুকিয়ে বাসায় আসে আয়েশা। টাকা চুরির বিষয়টি নিয়ে সেদিনও তর্কাতর্কি হয় গৃহকর্ত্রী লায়লা আফরোজের সঙ্গে। লায়লা আফরোজ বিষয়টি ফোনে তার স্বামীকে জানাতে চেষ্টা করলে পেছন থেকে ছুরি মারে আয়েশা। এ সময় ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে লায়লা আফরোজকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে সে। মায়ের চিৎকার শুনে ঘুম থেকে ওঠা নাফিসা এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করে আয়েশা। নাফিসা ইন্টারকমে গার্ডকে ফোন দিতে চাইলে আয়েশা ইন্টারকমের তার ছিঁড়ে ফেলে। আয়েশার ছুরিকাঘাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে দুজনেরই মৃত্যু হয়। ঘটনার পর নিজের রক্তমাখা কাপড় বদল করে আয়েশা। এরপর নাফিসার স্কুল ড্রেস পরে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। ব্যাকপ্যাকে নেয় ল্যাপটপ ও ফোন। ঢাকা ছাড়ার সময় সিংগাইর ব্রিজ থেকে ফোন ও পোশাকভর্তি ব্যাগ নদীতে ফেলে দেয় সে।
এক প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল বলেন, আয়েশার আগে থেকেই চুরির স্বভাব রয়েছে। এমনকি নিজের বোনের বাড়ি থেকেও ২ লাখ টাকা ও ৪ ভরি স্বর্ণালংকার চুরি করেছিল সে। এর আগে হুমায়ুন রোডে চুরির ঘটনায় থানা পুলিশ তাকে আটক করেছিল। আয়েশার গলার পোড়া রহস্য নিয়ে তিনি বলেন, গলা পোড়া নিয়ে আমরা দুই ধরনের তথ্য পেয়েছি। একবার সে নিজের মায়ের সঙ্গে রাগারাগি করে নিজের গায়ে আগুন দিয়েছিলÑ তাতে ওই দাগ তৈরি হয়। আরেকটি বিষয় জানা গেছে, অন্য এক বাড়িতে কাজ করার সময় চুলার আগুনে তার গলা পুড়ে যায়।
অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, আপনারা যারা বাসায় গৃহকর্মী রাখেন তারা তাদের পরিচয় নিশ্চিত হবেন। আপনার বাসায় কাজ করা ব্যক্তির পরিচয়পত্র ও তাকে শনাক্তকারী ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করে রাখবেন। কারণ আপনি বাসার গৃহকর্মীর বানানো খাবার খান, আপনার বেড রুমে গৃহকর্মী প্রবেশ করে। এখানে আপনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় জড়িত।




