বিএনপি ও জামায়াতের ভোটের পার্থক্য এখন ১.১ শতাংশ

0
155

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যত সামনে আসছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ততটাই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নির্বচানকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত সর্বশেষ জনমত জরিপে প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তিÑ বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত মিলেছে। জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, বিএনপির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ৩৪.৭ শতাংশ, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে মত দিয়েছেন ৩৩.৬ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার। এ নির্বাচনে আনডিসাইডেড (সিদ্ধান্তহীন) ভোটার থাকতে পারে ১৭.০ শতাংশ। অন্য দলগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি (এনসিপি) ৭.১, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৩.১ এবং অন্যান্য দল ৪.৫ শতাংশ ভোট পাবে।
সোমবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রাক-নির্বাচনী জরিপ প্রকাশ করা হয়। ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দুই হাজার ছাব্বিশ’ শীর্ষক এ জরিপটি প্রকাশ করে ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি। জরিপটি পরিচালনায় যৌথভাবে কাজ করেছে প্রজেকশন বিডি, জাগরণ ফাউন্ডেশন ও ন্যারেটিভ।
জরিপে আরও উঠে এসেছে, মোট ভোটারের প্রায় ছিয়াশি শতাংশ ভোটাধিকার প্রয়োগে আগ্রহী। সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের সম্ভাব্য অবস্থান যুক্ত করলে বিএনপির সমর্থন দাঁড়াতে পারে প্রায় তেতাল্লিশ শতাংশের কাছাকাছি এবং জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন পৌঁছাতে পারে প্রায় একচল্লিশ শতাংশের মতো।
জরিপের পরিসর ও পদ্ধতি ॥ এই জনমত জরিপটি ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত হয়। এতে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার ২৯৫টি সংসদীয় আসনের অন্তর্ভুক্ত মোট ২২ হাজার ১৭৪ জন নিবন্ধিত ভোটার অংশগ্রহণ করেন। শহর-গ্রাম, অঞ্চল ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্য নিশ্চিত করতে স্তরভিত্তিক নমুনা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় এবং জাতীয় আদম শুমারির তথ্যের আলোকে পরবর্তী ওজন প্রয়োগ করা হয়েছে।
ভোটারদের ভাবনা ও দলভিত্তিক সমর্থনের কারণ ॥ বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে প্রায় ৭২ শতাংশ জানিয়েছেন, দলটির রাষ্ট্র পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক দক্ষতাই তাদের সমর্থনের প্রধান কারণ। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৩০ থেকে ৪৪ এবং ৩৫ থেকে ৫৯ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিএনপির সমর্থন তুলনামূলক বেশি। পেশাভিত্তিক হিসাবে কৃষক ও শ্রমজীবী শ্রেণির মধ্যেও দলটির অবস্থান শক্ত।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকরা দলটির প্রতি আস্থা রাখার পেছনে মূলত কম দুর্নীতির ভাবমূর্তি ও সততার পরিচয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। তরুণ ভোটারদের মধ্যে দলটির গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি, বিশেষ করে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে। উচ্চশিক্ষিত, বিশেষ করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের মধ্যেও জামায়াতের সমর্থন অন্য দলগুলোর তুলনায় এগিয়ে। ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণ ও শিক্ষিত ভোটারদের সম্পৃক্ত করায় দলটি বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি (এনসিপি)কে সমর্থন দেওয়া ভোটারদের একটি বড় অংশ জানিয়েছেন, জুলাই অভ্যুত্থানে দলটির ভূমিকা তাদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের প্রায় ১৭ শতাংশ এখনো ভোটের সিদ্ধান্ত নেননি। এই অংশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার জানিয়েছেন, তারা কোনো রাজনৈতিক দলকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না। আবার একটি বড় অংশ মতামত দিতেও অনিচ্ছুক ছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তহীন ভোটাররাই শেষ মুহূর্তে নির্বাচনের ফল পাল্টে দিতে পারেন।
সামগ্রিকভাবে জরিপটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ’২৬ সালের নির্বাচন হবে একদিকে অভিজ্ঞতা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার রাজনীতি। অন্যদিকে সততা, ন্যায়বিচার ও মূল্যবোধের রাজনীতির মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ লড়াই। ভোটারদের বড় অংশই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনে জরিপের ফল উপস্থাপন করেন ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসির কর্মকর্তা শফিউল আলম শাহীন। তিনি বলেছেন, জরিপকারী প্রতিষ্ঠান বলছে, মেশিন লার্নিং প্রজেকশন অনুযায়ী সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের ঝোঁক বিবেচনায় নিলে বিএনপির সমর্থন ৪৩.২ শতাংশ এবং জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ৪০.৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। জরিপের ফল অনুযায়ী আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের একটি বিশাল অংশ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আইআইএলডির নির্বাহী পরিচালক শফিউল আলম শাহিন ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসির চেয়ারম্যান ড. মাহফুজুল হক, সোয়াশ ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মুশতাক খান, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেসের ডিন ড. এ কে এম ওয়ারেসুল করিম, ইউনিভার্সিটি অব রেজিনার সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ, বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী এ কে এম ফাহিম মাশরুর, গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী এবং সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) আমসা আমিন প্রমুখ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here