ভোরের আলো ফোটার আগেই আগুনমুখা নদীর তীরে শুরু হয় কাঠে কাঠুরের আঘাত। দূর থেকে চোখে পড়ে উঁচু মাস্তুল, কাছে আসতেই কানে বাজে টুকুর-টাকুর শব্দ। নতুন কাঠের গায়ে নিপুণ হাতে গড়ে উঠছে বঙ্গোপসাগরগামী মাছ ধরার ট্রলার। শীতের মিষ্টি রোদ মাথায় নিয়েও থেমে নেই কারিগরদের কর্মব্যস্ততা। ঘামে ভেজা শরীর, ক্লান্ত চোখ—তবুও কাজে কোনো ফাঁকি নেই। এই নদীর তীর যেন হয়ে উঠেছে শ্রম, অভিজ্ঞতা আর জীবনের ঝুঁকির এক নীরব কর্মশালা।
এখানকার ট্রলার নির্মাণ কোনো কারখানাভিত্তিক শিল্প নয়। এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গড়ে ওঠা দেশীয় কারিগরি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ফল। প্রতি বছর মহাজনদের চাহিদা অনুযায়ী আগুনমুখা নদীর তীরে তৈরি হয় একের পর এক সমুদ্রগামী মাছ ধরার ট্রলার। আকার, নকশা, সক্ষমতা—সবই নির্ধারিত হয় মহাজনের ইচ্ছা ও সাগরের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে।
চার দশকের বেশি সময় ধরে এই শিল্পে যুক্ত হেড মিস্ত্রি রাখাল মণ্ডল বলেন, একটি ট্রলার বানানোর আগে কাগজে নকশা আঁকতে হয়, গ্রাফ করে নিতে হয় পুরো কাঠামো। তবে অনেক কিছুই অভিজ্ঞতার কারণে মাথার ভেতরেই আঁকা থাকে। তিনি জানান, বড় আকারের একটি সমুদ্রগামী ট্রলার তৈরি করতে ৮০ থেকে ৯০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয় এবং সময় লাগে তিন থেকে সাড়ে তিন মাস। ট্রলার তৈরি শেষ হলেও দায়িত্ব শেষ হয় না। সাগরে ভাসিয়ে একদিন চালিয়ে পরীক্ষা করার পর কোনো সমস্যা না থাকলেই মিস্ত্রির কাজ সম্পন্ন হয়।
এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের জীবনও কম সংগ্রামের নয়। ট্রলার নির্মাণে কর্মরত সুজিৎ জানান, কখনো চুক্তিভিত্তিক আবার কখনো দৈনিক মজুরিতে কাজ করতে হয়। দক্ষতার ওপর নির্ভর করে দৈনিক ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি পাওয়া যায়। পারিবারিকভাবে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত না হলেও এক ওস্তাদের হাত ধরে এই কাজে আসেন তিনি। এখন এই কাজই তার জীবিকার একমাত্র ভরসা।
নির্মাণাধীন আরেকটি ট্রলারের হেড মিস্ত্রি ফারুক জানান, তার ট্রলারটির দৈর্ঘ্য ৫৪ ফুট, উচ্চতা ১০ ফুট এবং পেছনের প্রস্থ ১০ ফুট। মাস্তুলের দিকে প্রস্থ ধাপে ধাপে কমে আসে। একটি আস্ত গাছ দিয়ে তৈরি মাস্তুলের ব্যাস ন্যূনতম ১০ ফুট হতে হয়। ট্রলারের কাঠামোতে দুই থেকে পাঁচ ইঞ্চি পর্যন্ত লোহার ব্যবহার রয়েছে। নির্মাণে ব্যবহৃত হয় রেন্ট্রি, মেহগনি, কড়ই ও চাম্বল কাঠ।
তবে এই ট্রলার শুধু কাঠ আর লোহার সমাহার নয়, এটি মহাজনদের জন্য ভাগ্যের পরীক্ষাও বটে। ট্রলার মালিক মাছুম মল্লিক জানান, তার ট্রলার নির্মাণে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। সাধারণত একটি ট্রলার সর্বোচ্চ ১০ বছর ভালো থাকে। সমুদ্রে মাছ ধরার ক্ষেত্রে ভাগ্য ভালো হলে এক ট্রিপেই অর্ধকোটি টাকা লাভ করা সম্ভব, আবার খারাপ হলে এক থেকে দেড় লাখ টাকা লোকসানও গুনতে হয়। আগে এক মৌসুমেই ট্রলারের খরচ উঠে যেত, এখন তিন বছরেও তা সম্ভব হয় না। এই ব্যবসায় লাভের চেয়ে লোকসানের ঝুঁকিই বেশি—কেউ এখানে লাখপতি হন, আবার কেউ নিঃস্ব হয়ে যান।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. জহিরুন্নবী বলেন, বৈরী আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক সময় হতাশ হয়ে জেলেরা সাগর থেকে তীরে ফিরে আসেন। তবুও তারা ভেঙে পড়েন না। নতুন ট্রলার নির্মাণে আবারও সাহস জোগান। এই ট্রলার নির্মাণ শিল্পে পরিকল্পিত পৃষ্ঠপোষকতা ও সহায়তা বাড়ানো গেলে জেলেরা দেশের অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। নৌপথ ভরাট হয়ে গেলেও সমুদ্রে মাছ আহরণের প্রয়োজন থাকায় এই শিল্পের চাহিদা ভবিষ্যতেও বাড়বে।
কাঠের গায়ে কাঠুরের আঘাতে যেমন তৈরি হয় একটি ট্রলার, তেমনি ঘাম, অভিজ্ঞতা আর ঝুঁকির সমন্বয়ে তৈরি হয় উপকূলের মানুষের জীবনসংগ্রামের এক শক্ত ভিত। আগুনমুখা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি ট্রলার তাই শুধু মাছ ধরার নৌযান নয়—এগুলো উপকূলবাসীর স্বপ্ন, সাহস আর টিকে থাকার গল্প।




