কৃষিপণ্যের দামে অস্থিরতার নেপথ্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য: বাংলাদেশ ব্যাংক

0
7

দেশে চাল, আলু, পেঁয়াজ, ব্রয়লার মুরগি ও ডিম—নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পাঁচ কৃষিপণ্যের দামে অস্বাভাবিক ওঠানামার প্রধান কারণ হিসেবে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট, দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও অদক্ষ বাজার ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ভ্যালু চেইন ইফিসিয়েন্সি অব এগ্রিকালচারাল প্রডাক্টস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে এসব তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ পাঠ করেন গবেষণা দলের প্রধান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের পরিচালক সেলিম আল মামুন।
দুই ধাপে গবেষণা, ১৮ জেলার মাঠতথ্য
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, গবেষণাটি দুই ধাপে পরিচালিত হয়। প্রথম ধাপ ২০২৫ সালের ৫ থেকে ১৬ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় ধাপ ১৫ জুন থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত। এ সময় ১৮টি জেলার ৬১টি উপজেলায় ‘পারপাসিভ র‍্যান্ডম স্যাম্পলিং’ পদ্ধতিতে ৪২৬ জন উত্তরদাতার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আগস্ট মাসে গবেষণা প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করা হয়।
চালের বাজার মিলারনির্ভর
গবেষণায় দেখা গেছে, বোরো মৌসুমে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে কৃষকের গড় খরচ ৮৭২ টাকা হলেও কৃষকরা ধান বিক্রি করেছেন ১ হাজার ১২৫ থেকে ১ হাজার ৪৫০ টাকায়। কৃষক পর্যায়ে কিছু মুনাফা থাকলেও চালের বাজার পুরোপুরি মিলারনির্ভর হয়ে পড়েছে।
কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি চালের দাম ৫০ টাকা হলেও খুচরা পর্যায়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ দশমিক ৫০ টাকায়। মিলাররা চালের পাশাপাশি তুষ ও কুঁড়া বিক্রি করে প্রতি মণে অতিরিক্ত গড়ে ১০৬ টাকা আয় করছেন, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
আলুর দামে সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিমাগারে
আলুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় মূল্যবৃদ্ধি ঘটে কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার পর্যায়ে। কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ ১০ দশমিক ৬৩ টাকা হলেও কৃষক বিক্রি করেন ১৮ দশমিক ৪৪ টাকায়। হিমাগার থেকে বের হওয়ার সময় দাম দাঁড়ায় ২৮ দশমিক ৮০ টাকা এবং খুচরা বাজারে তা বেড়ে হয় ৪৫ দশমিক ৮০ টাকা।
গবেষণায় বলা হয়, হিমাগার গেট থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত মধ্যস্বত্বভোগীদের উচ্চ মুনাফাই আলুর দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি কেজিপ্রতি ৬ দশমিক ৭৫ টাকা হিমাগার ভাড়া কমানোর সুযোগ রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পেঁয়াজে সংকটের কারণ সংরক্ষণ দুর্বলতা:
পেঁয়াজের দামের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও ওজন হ্রাসের বিষয়টি। কৃষক পর্যায়ে কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ ১৯ দশমিক ২৪ টাকা, বিক্রয়মূল্য ৪৬ দশমিক ৯৪ টাকা এবং খুচরা বাজারে দাম দাঁড়ায় ৮০ দশমিক ৭৫ টাকা।
দীর্ঘ সময় বাড়িতে সংরক্ষণে প্রতি মণ পেঁয়াজে প্রায় ১২ কেজি পর্যন্ত ওজন কমে যায়। ফলে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে সরবরাহ সংকট তৈরি হয় এবং দাম কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকায় ওঠার আশঙ্কা থাকে। তবে গবেষণায় পেঁয়াজের বাজারে কোনো সিন্ডিকেট বা কৃত্রিম সংকটের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ব্রয়লার মুরগি ও ডিমে খামারিদের চাপ
ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রে খামারিরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকি নিলেও মুনাফা খুবই সীমিত। কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ ১৬৩ দশমিক ৫৩ টাকা, খামারির বিক্রয়মূল্য ১৭২ দশমিক ১৮ টাকা এবং খুচরা বাজারে দাম ১৯৫ দশমিক ৩৩ টাকা। মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশই যায় খাবারের পেছনে। জরিপ চলাকালে অনেক খামারি কেজিপ্রতি ১২ টাকা পর্যন্ত লোকসান করেছেন।
ডিম উৎপাদনেও একই চিত্র দেখা গেছে। একটি ডিমের উৎপাদন খরচ ৯ দশমিক ৪৭ টাকা, খামারি বিক্রি করেন ১০ দশমিক ২৬ টাকায় এবং খুচরা বাজারে দাম দাঁড়ায় ১১ দশমিক ৭৭ টাকা। ডিম উৎপাদনের মোট খরচের প্রায় ৮৫ শতাংশই ফিডের জন্য ব্যয় হয়। অফ-সিজনে ছোট খামারিরা লোকসানে পড়লেও বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে।
বাজার স্থিতিশীল রাখতে যেসব সুপারিশ
কৃষিপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—আলু ও পেঁয়াজের জন্য উন্নত ও বিকল্প সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, কৃষকদের জন্য নগদ সহায়তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, পশুখাদ্যের দাম নিয়মিত মনিটরিং এবং ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য কন্ট্রাক্ট ফার্মিং মডেল চালু করা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here