নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা অসাধু ব্যবসায়ীদের

0
18

জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ করার পরই নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে পবিত্র শবে-বরাত ও রমজান মাস সামনে। এ অবস্থায় রোজায় বেশি ব্যবহার হয় এমন সব নিত্য ও ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা বলার চেষ্টা করছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেড়ে গেছে তাই নিত্যপণ্যের দামও বাড়ছে। অথচ জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদনটি একটি সুপারিশ মাত্র। এটি কবেনাগাদ বাস্তবায়ন হবে কিংবা আদৌ শতভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব কি না সেই বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন মতামত তুলে ধরেছেন। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, এটি এখনই বাস্তবায়ন নয়। নির্বাচিত সরকার এসে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিবেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জাতীয় বেতন কমিশন বাস্তবায়ন হলে দ্রব্যমূল্য বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। এছাড়া বেসরকারিখাতে বাড়তি চাপ তৈরি হবে। ফলে জাতীয় বেতন কমিশনের এই সুপারিশ বাস্তবায়নের আগে বাজার পরিস্থিতি আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। তাদের মতে, শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো এবং বেসরকারিখাতকে উপেক্ষিত করা হলে অর্থনীতিতে আরও গভীর সংকট তৈরি করতে পারে। বর্তমানে ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে নবম পে স্কেল বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে আরও অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকায় গুনতে হবে। এর প্রভাব পড়বে কোটি কোটি বেসরকারিখাতের চাকরিজীবীদের ওপর।
নভেম্বর ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এখন আবার তা দুই অঙ্কের ঘর ছুঁইছুঁই করছে। এ অবস্থায় শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হলে বাজার পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। নিত্যপণ্যের বাজার স্বাভাবিক থাকবে এই ধরনের পলিসি এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এর আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণা ও বাস্তবায়ন করলে বেসরকারিখাতে যে বাড়তি চাপ তৈরি হয় তা থেকে আজও সাধারণ মানুষ বের হতে পারেনি। প্রতিবছর এখনো ১০ শতাংশ হারে বেতন বাড়ছে সরকারি চাকুরেদের। বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সবজি ও পেঁয়াজ ছাড়া এখন বেশিরভাগ নিত্যপণ্যের দাম বেশি। ডিম ও মুরগির দাম কমলেও তা সাময়িক। এ দুটি পণ্যের দাম দ্রুত পরিবর্তন হয়ে থাকে। চাহিদা বাড়লেও হু হু করে বেড়ে যায় ডিম ও মুরগির দাম।
এ ছাড়া চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, আটা, চিনি, মসলা জাতীয় পণ্য এবং গরু ও খাসির মাংসের দাম বেশি। ভরা মৌসুমেও কমেনি চালের দাম। রমজান মাস সামনে রেখে ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল ও ছোলার দাম ইতোমধ্যে বেড়ে গেছে। এসব পণ্যের বিপুল পরিমাণ আমদানি হলেও বেতন বৃদ্ধির সুপারিশের খবরেই দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এ নিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের সঙ্গে খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে রীতিমতো কথা কাটাকাটি হচ্ছে। বেতন যে এখনো বাড়েনি এটাই বিশ্বাস করছে না সাধারণ খুচরা ব্যবসায়ীরা।  রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে এক সপ্তাহ আগেও সোনালি মুরগির দাম ছিল ২৭০ থেকে ২৮০ টাকা কেজি। শুক্রবার ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি বিক্রি হতে দেখা যায়। ব্রয়লার মুরগির দাম আগের মতো ১৮০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। ডিমের দামও গত সপ্তাহের মতো ১১০-১২০ টাকা ডজনে বিক্রি হচ্ছে। সরু নাজিরশাইল ও মিনিকেট চাল ৭৫-৮০, মাঝারি মানের পাইজাম ও লতা চাল ৬০-৬৮ এবং মোটা জাতের স্বর্ণা ও চায়না ইরি ৫৫-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শবে-বরাত সামনে রেখে বেশিরভাগ ডাল জাতীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি চাকরিতে এভাবে ঢালাও বেতন বৃদ্ধি অর্থনীতিতে প্রচণ্ড নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই বেতন বৃদ্ধি বেসরকারি খাতে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করবে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেসরকারি খাতেও বেতন বৃদ্ধির চাপ সৃষ্টি হবে। এই পে স্কেল বাজারে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি করবে। গবেষণায়, দেখা গেছে, প্রতিবার পে স্কেল ঘোষণার পর তিন দফায় বাজারে দাম বৃদ্ধি পায়। প্রথম ধাপে বাড়ে যখন পে স্কেল ঘোষণা করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে বাড়ে যখন এটা কার্যকর করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। আর তৃতীয় ধাপে বাড়ে যখন নতুন পে স্কেল অনুযায়ী বেতন পাওয়া শুরু হয়। অর্থনৈতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবার পে স্কেলের সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে শতকরা ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, এবারের পে স্কেলের কারণে জিনিসপত্রের দাম দ্বিগুণের বেশি হবে। এমনিতেই নিম্নআয়ের মানুষ থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ বাজারে গিয়ে আর্তনাদ করেন। জিনিসপত্রের দাম এখনই অস্বাভাবিক, বেশিরভাগ মানুষেরই নাগালের বাইরে। এর ওপর এই সিদ্ধান্ত বাজার পরিস্থিতি ভয়াবহ করে তুলবে। সরকার গত দেড় বছরে মুদ্রাস্ফীতি সামাল দিতে পারেনি। দেশে এখন মুদ্রাস্ফীতি ৮ শতাংশের বেশি। নতুন পে-স্কেল চালু হলে মুদ্রাস্ফীতি ২০ থেকে পঁচিশ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here