আধুনিক জীবনযাপনে শুধু আয় করা নয়, টাকা কীভাবে খরচ করা হয় তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিলাসবহুল জীবনধারা, ব্র্যান্ডের পোশাক, দামি গাড়ি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রদর্শনের চাপ অনেককেই অজান্তে অর্থ অপচয়ের ফাঁদে ফেলে দেয়। বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগগুরু ওয়ারেন বাফেট বহুবার সতর্ক করেছেন, টাকাকে বিবেচনামূলকভাবে ব্যয় এবং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিনিয়োগ করাই প্রকৃত সম্পদ সৃষ্টির মূলমন্ত্র।
বাফেটের জীবন নিজেই এ দর্শনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। শত কোটি ডলারের মালিক হয়েও তিনি সাধারণ জীবনযাপন করেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, “নিয়ম নম্বর এক: অর্থ হারাবেন না। নিয়ম নম্বর দুই: নিয়ম নম্বর এক কখনো ভুলবেন না” শুধু শেয়ারবাজার নয়, প্রতিটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রযোজ্য।
৯৪ বছর বয়সী এই বিনিয়োগগুরু মনে করেন, যারা জানেন কোথায় টাকা ব্যয় করা উচিত নয়, তারা প্রকৃত অর্থে নিজেদের সম্পদ সুরক্ষিত রাখতে পারেন। তাঁর মতে, নিচের পাঁচটি ক্ষেত্রে কখনো টাকা ব্যয় করা উচিত নয়।
প্রথমত, নতুন গাড়ি কেনা। নতুন চাকরি বা পদোন্নতির আনন্দে অনেকেই গাড়ি কেনাকে সফলতার প্রতীক মনে করেন। তবে বাফেটের মতে, এটি সবচেয়ে বড় আর্থিক ভুলগুলোর মধ্যে একটি। কারণ নতুন গাড়ি শোরুম থেকে বের হওয়া মাত্রই মূল্য হারাতে শুরু করে; পাঁচ বছরের মধ্যে দাম প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যেতে পারে। নিজে তিনি চালান ২০১৪ সালে কেনা একটি ক্যাডিলাক এক্সটিএস। তাঁর যুক্তি, গাড়ি হলো চলাচলের মাধ্যম, সম্পদের প্রদর্শন নয়।
দ্বিতীয়ত, ক্রেডিট কার্ডের সুদ। বাফেট বলেন, ক্রেডিট কার্ড ঋণ এমন একটি ফাঁদ, যেখান থেকে বের হতে গিয়ে বড় অংকের অর্থ হারাতে হয়। অনেক দেশে বাৎসরিক সুদের হার ৩০ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ ১ লাখ টাকা ধার নিলে এক বছরে শুধু সুদেই দিতে হতে পারে ৩০ হাজার টাকার বেশি। তিনি বলেন, “যদি আপনি বুদ্ধিমান হন, তাহলে ঋণ ছাড়াই অর্থ উপার্জন করতে পারবেন।”
তৃতীয়ত, জুয়া ও লটারি। বাফেট এগুলোকে বলেন “গণিত না জানাদের ওপর কর।” জুয়ার কারণে মানুষ পরিশ্রম ও বাস্তব বিনিয়োগ থেকে দূরে সরিয়ে ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লটারিতে জেতার সম্ভাবনা প্রায় এক মিলিয়নে এক, তবে হারানোর সম্ভাবনা শতভাগের কাছাকাছি।
চতুর্থত, প্রয়োজনের চেয়ে বড় বাড়ি। অনেকেই সামাজিক মর্যাদা দেখানোর জন্য বড় বাড়ি নিয়ে ব্যয় করেন, যা বাফেটের মতে আর্থিক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। তিনি এখনও থাকেন সেই একই বাড়িতে, যা কিনেছিলেন ১৯৫৮ সালে। তাঁর ভাষায়, “বাড়ি হলো থাকার জায়গা, মর্যাদা দেখানোর নয়।” বড় বাড়ি মানে বাড়তি কর, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ।
পঞ্চমত, জটিল বিনিয়োগ পণ্য। বাফেটের নীতি হলো, “যে ব্যবসা আপনি বোঝেন না, তাতে কখনো বিনিয়োগ করবেন না।” আজকের বাজারে দ্রুত লাভের প্রলোভনে নানা জটিল বিনিয়োগ পণ্য এসেছে। তবে যা সহজে বোঝা যায় না বা ‘দ্রুত ধনী হওয়ার’ প্রতিশ্রুতি দেয়, সেটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক। তিনি বলেন, “ঝুঁকি তখনই আসে, যখন আপনি জানেন না আপনি কী করছেন।”
এই দর্শন থেকে তিনটি শিক্ষা স্পষ্ট হয়: প্রয়োজন চিনে ব্যয় করুন, যা বুঝবেন না তাতে বিনিয়োগ করবেন না, আর ব্যয়ের চেয়ে সঞ্চয় ও বিবেচিত বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিন। বাফেটের ভাষায়, “যা খরচ করার পর বাঁচে তা সঞ্চয় করবেন না; বরং যা সঞ্চয় করার পর বাঁচে, কেবল সেটাই খরচ করুন।” এই অভ্যাসগুলো যদি সময়মতো শেখা যায়, অর্থ অপচয় কমে আসে এবং সঞ্চয়ের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সম্পদ।




