সংসদ ভবনে উচ্চকক্ষের ১০০ সদস্যের আসন বিন্যাসের উদ্যোগ

0
12

সংসদীয় ব্যবস্থায় সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষ গঠনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে সংসদ সচিবালয়। সম্ভাব্য ১০০ জন সদস্যের বসার স্থান নির্ধারণে জাতীয় সংসদ ভবনের পঞ্চম তলার দর্শক গ্যালারিগুলোকে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। স্থাপত্য ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের কারিগরি সহায়তায় এই সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রাথমিক প্রস্তুতি চলছে। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা কৌশলগত কারণে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জানা যায়, বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের নকশা ঠিক রেখেই উচ্চকক্ষের ১০০ আসনের সদস্যদের বসার জায়গা খুঁজে বের করার এই বিকল্প ভাবনা মাথায় রেখে সাজানো হচ্ছে পরিকল্পনা। সংসদ ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত মূল অধিবেশন কক্ষে ৩৫৪ জনের জন্য আসনের ব্যবস্থা রাখা আছে। এর মধ্যে ৩০০ জন সংসদ-সদস্য এবং ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ-সদস্যদের জন্য। আর বাকি চারটি টেকনোক্রেট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের জন্য। তৃতীয় তলায় অধিবেশন কক্ষের বাইরে স্পিকারের বসার জায়গা। তার দুই পাশে আরও ১০০টি আসন রয়েছে। বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, কূটনীতিক, বিদেশি ডেলিগেট, আমলাসহ সমাজের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা এসব আসনে বসে অধিবেশনের কার্যক্রম দেখার সুযোগ পান। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

প্রতিবেদনে আরো জানা যায়, সূত্র জানায়, সংসদ সচিবালয় প্রথমে স্পিকারের বসার জায়গার দুই পাশে থাকা ১০০টি আসন উচ্চকক্ষের সদস্যদের বসার জন্য নির্ধারণের পরিকল্পনা নেয়। কিন্তু বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, কূটনীতিক, বিদেশি ডেলিগেট, আমলাসহ সমাজের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বসার জন্য বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করতে পারেননি তারা। এ অবস্থায় সংসদ ভবনের পঞ্চম তলায় অবস্থিত পাঁচটি দর্শক গ্যালারির মধ্য থেকে পাশাপাশি থাকা দুটি দর্শক গ্যালারি একত্রিত করে উচ্চকক্ষের সদস্যদের বসার জায়গা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে। বসানো হবে টেবিল-চেয়ার ও সাউন্ড সিস্টেমসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার আগামী নির্বাচিত সরকার এবং সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে বলে সংসদ সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরের মাথায় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় শাসনব্যবস্থার যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই দিনে জুলাই সনদের পক্ষে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। এই ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে নিম্নকক্ষের পাশাপাশি জাতীয় সংসদে প্রথমবার যুক্ত হবে উচ্চকক্ষ। তবে এর আগে নির্বাচিত সংসদের সদস্যরা ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনবেন। জুলাই সনদে এজন্য ১৮০ কর্মদিবস বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এর পরপরই আনুপাতিক হারে (পিআর) বিভিন্ন দল মনোনীত ১০০ আসনের সদস্যদের নিয়ে গঠন করা হবে উচ্চকক্ষ; যা এদেশের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় নতুন নজির স্থাপন করবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ও প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজমুদার বলেন, গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’-সূচক হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই প্রতিনিধিরা একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। তিনি বলেন, এর মেয়াদ হবে নিুকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট এই উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। এর মধ্য দিয়ে দেশের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় নতুন যুগে পা দেবে বাংলাদেশ।

এদিকে উচ্চকক্ষের ১০০ জন্য সদস্য জাতীয় সংসদ ভবনের কোথায় বসবেন-এ নিয়ে নির্বাচনের আগেই সংসদ সচিবালয়ের উদ্যোগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। স্থপতি লুই আই কানের নকশায় তৈরি করা জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে উচ্চকক্ষের সদস্যদের বসার জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। মূলত সংসদ ভবনের ভেতরের আসনবিন্যাসের সময় উচ্চকক্ষের বিষয়টি কারও মাথায় ছিল না। কিন্তু এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং এর পরপরই সংসদ অধিবেশন শুরুর ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী এনে উচ্চকক্ষের বিধান যুক্ত করা হলে নতুন করে আসনবিন্যাস করতে হবে। বিষয়টি মাথায় রেখেই সংসদ সচিবালয় কাজ করছে। লুই আই কানের নকশা ঠিক রেখেই উচ্চকক্ষের ১০০ আসনের সদস্যদের বসার জায়গা খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একাধিক বিকল্প মাথায় রেখে সাজানো হচ্ছে পরিকল্পনা।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এর তিন দিন পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়। নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস হন এই সরকারের প্রধান। তিনি দায়িত্ব নিয়েই প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য একটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করেন। ওই বছরেরই ১১ সেপ্টেম্বর থেকে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর তৈরি হয় জুলাই সনদ। ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় এই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা জুলাই সনদের প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। ২৫টি রাজনৈতিক দল ও জোট এতে স্বাক্ষর করে। জুলাই সনদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে বা পিআর পদ্ধতিতে ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে একমত হয় বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here