‘পর পর দুবারের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না’, ‘ নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা’, ‘জুলাই সনদের আলোকে কমিশন গঠন’ এবং নির্বাচিত হলে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থান। বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ রাষ্ট্র গঠনে নানা চমক নিয়ে প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে বিএনপির ইশতেহার। আগামীকাল মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সম্ভাব্য ইশতেহার ঘোষণার দিনক্ষণ ঠিক রেখেছে দলটি। তৈরি করা হয়েছে ২৭ দফা।
দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা ও চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ঘোষিত ‘ভিশন-২০৩০’- এর রূপরেখা সংযোজিত হয়েছে এতে। ২৭ দফার আলোকেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার চূড়ান্ত বলে বিশ্বস্ত সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ প্রবাস জীবনের অবসান ঘটে তারেক রহমানের। দেশের মাটিতে পা রাখেন তিনি। মায়ের মৃত্যুর পর হয়েছেন ভারমুক্ত। এখন তিনি দলের চেয়ারম্যান। তাঁর অধীনে এবার বিএনপি ভোটের মাঠে লড়াই করছেন। ভোটের প্রচারণায় ছুটছেন সারাদেশে। আওয়ামী লীগ বিহীন জামায়াতের সঙ্গে চলছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে তরুণ প্রজন্মকে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবারের নির্বাচনকে অত্যন্ত কঠিন নির্বাচন বলেও দাবি করছে দলটি। সব বিবেচনায় একটি কল্যাণরাষ্ট্র গঠনে এবার নির্বাচনী ইশতেহারে অতীতের চাইতে বেশি চমক রাখা হয়েছে।
নির্বাচিত হলে দেশের জনগণকে নিয়ে পরিকল্পনা, জনসেবা ইত্যাদি তুলে ধরবে দলটি। ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তার পাশাপাশি জনসম্পৃক্ত নানা কর্মসূচির উল্লেখ থাকবে। এছাড়া প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থানের ঘোষণা দলটি আগেই দিয়ে আসছে। এর বাইরে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, পরিবেশ, কর্মসংস্থান ও ধর্মীয় নেতাদের জন্য উন্নয়ন সেবার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের উন্নয়ন বা সেবার কথা বলবে বিএনপি। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবার, আহত যোদ্ধাদের জন্য থাকবে ভিন্ন পরিকল্পনা। সম্মান এবং মর্যাদায় তাদের জন্য আসবে বিশেষ প্রতিশ্রুতির বার্তা।
জানা যায়, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, মানবাধিকার রক্ষা ও দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালীকরণ ইশতেহারের কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। দলের নীতিনির্ধারকরা জানান, জনগণকে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলাই হবে বিএনপির অঙ্গীকার। ইশতেহারে বিএনপির ৩১ দফার মূল বিষয়- নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাকসাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন ও জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার বিশদভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এছাড়া জুলাই সনদের আলোকে মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা দেওয়ার পরিকল্পনাও ইশতেহারে গুরুত্ব পাবে। জানা যায়, সর্বশেষ স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলীয় প্রচারের কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারে কী কী বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে, তা নিয়ে নেতারা মতামত দেন। কৌশল অনুযায়ী নির্বাচনী প্রচারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশাকে আলাদাভাবে টার্গেট করবে বিএনপি।
বিএনপির বিশ্বস্ত সূত্রগুলো বলছে সমসাময়িক বিষয়গুলোর সঙ্গে বিএনপির ২৭ দফার আলোকেই থাকবে মূল ইশতেহার। মূল পয়েন্টে সেগুলো যুক্ত রেখেছে দলটি। তা হলো-
১. একটি ‘সংবিধান সংস্কার কমিশন’ গঠন করে বর্তমান ‘অবৈধ’ আওয়ামী লীগ সরকারের গৃহীত সব অযৌক্তিক, বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক সাংবিধানিক সংশোধনী ও পরিবর্তনগুলো পর্যালোচনা করে তা রহিত বা সংশোধন করা। ২. প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘রেইনবো নেশন’ প্রতিষ্ঠা। ৩. একটি নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা।
৪. রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা। ৫. পরপর দুবারের বেশি কেউ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। ৬. বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে উচ্চকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা প্রবর্তন। ৭. সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করার বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। ৮. বর্তমান ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন-২০২২’ সংশোধন করা। ৯. সাংবিধানিক সব প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও শুনানির মাধ্যমে সংসদীয় কমিটির ভোটিং সাপেক্ষে এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া। ১০. নিশ্চিত করা হবে বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা। বর্তমান বিচারব্যবস্থা সংস্কারের জন্য গঠন করা হবে একটি ‘জুডিশিয়াল কমিশন’।
১১. একটি ‘প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন’ গঠন করে প্রশাসন পুনর্গঠন করা। ১২. মিডিয়ার সার্বিক সংস্কারের লক্ষ্যে একটি ‘মিডিয়া কমিশন’ গঠন করা।
১৩. দুর্নীতির ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না। অর্থপাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হবে। সংবিধান অনুযায়ী নিয়োগ করা হবে ন্যায়পাল। ১৪. সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা করা হবে আইনের শাসন। মানবাধিকার বাস্তবায়ন করা হবে ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইটস চার্টার অনুযায়ী।
১৫. অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠন করা হবে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন। ১৬. ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’—এ মূলনীতির ভিত্তিতে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবেন। ১৭. মুদ্রাস্ফীতির আলোকে শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা হবে।
১৮. বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতে দায়মুক্তি আইনসহ সব কালাকানুন বাতিল করা। ১৯. বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ভূখ-ের মধ্যে কোনো রকম সন্ত্রাসী তৎপরতা বরদাশত করা হবে না এবং কোনো সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা আশ্রয়-প্রশ্রয় পাবে না। সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদকে রাজনৈতিক ঢাল বা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এবং সন্ত্রাসবাদের ভিন্নমতবিরোধী শক্তি ও রাজনৈতিক বিরোধীদল দমনের অপতৎরতা বন্ধ করা হলে প্রকৃত সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করা ও আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া সম্ভব হবে।
২০. দেশের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সুসংগঠিত, যুগোপযোগী এবং সর্বোচ্চ দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত করে গড়ে তোলা। ২১. ক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকতর স্বাধীন, শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান করা হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে, যেন তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান ও উন্নয়ন কার্যক্রমে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ২২. রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নিবিড় জরিপের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের একটি তালিকা প্রণয়ন করা হবে এবং তাদের যথাযথ মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হবে। ২৩. যুবসমাজের ভিশন ও চিন্তা-চেতনাকে ধারণ করে প্রণয়ন করা হবে আধুনিক ও যুগোপযোগী যুব উন্নয়ন নীতিমালা।
২৪. নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। জাতীয় সংসদে মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারীদের গুরুত্ব দেওয়া এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। ২৫. প্রাধান্য দেওয়া হবে চাহিদাভিত্তিক ও জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাকে। ২৬. ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’—এ নীতির ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যের ‘এনএইচএস’র আদলে চালু করা হবে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা। ২৭. কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হবে। প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও শস্য বিমা, পশু বিমা, মৎস্য বিমা ও পোলট্রি বিমা চালু করা হবে। নিরুৎসাহিত করা হবে কৃষিজমির অকৃষি ব্যবহার।
এ বিষয়ে বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ বলেছেন, আমাদের মূল লক্ষ্য হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে সরকারকে বাধ্য করা। এর জন্য আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি। দাবি আদায় হলে আমরা অবশ্যই নির্বাচনে যাবো। নির্বাচনী ইশতেহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এরই মধ্যে আমরা রাষ্ট্র সংস্কারে ২৭ দফা জাতির কাছে উপস্থাপন করেছি। পরবর্তীসময়ে সবার পরামর্শে এই দফাগুলোর মধ্যে কিছু বিষয় সংযোজন বা বিয়োজন হতে পারে।
বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল বলেন, বাংলাদেশের মানুষকে আর আগের মতো ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এখন প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সেই পথেই হাঁটছে। তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে পরিবর্তনের সুযোগ। এ পরিবর্তন হতে পারে দায়িত্বশীল রাজনীতি, জনগণের অধিকার এবং একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের পথে যাত্রা। সময় এসেছে নীতিনির্ভর রাজনীতির। সময় এসেছে জনগণের জীবনে সত্যিকার পরিবর্তনের। ইশতেহারে থাকা প্রতিটি প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে সত্যিকার পরিবর্তন আনবে বলে আশা করি।




