ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দীর্ঘদিনের জোট-নির্ভরতা কাটিয়ে নিজস্ব শক্তিতে বড় ধরনের চমক দেখিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিজেদের সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জন করে দলটি এবার এককভাবে ৬৮টি আসনে জয়লাভ করেছে। শরিক দলগুলোর আসনসহ তাদের মোট আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭। যদিও তারা সরকার গঠনের সংখ্যাতত্ত্ব স্পর্শ করতে পারেনি, তবে বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী দলটি আগামী সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে।
নির্বাচনী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে ১৮টি এবং ২০০১ সালে ১৭টি আসন পেলেও ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে দলটির আসন সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩টি ও ২টি। সেই তুলনায় এবারের নির্বাচনে ৬৮টি আসনে একক জয় দলটির জন্য একটি ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ১৭ বছর পর নিজস্ব নেতৃত্বে জোট গঠন করে বিএনপির বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এই সাফল্য পাওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
জামায়াতের এই বিজয়ের মূল ভিত্তি ছিল দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। বিভাগীয় বিশ্লেষণের চিত্রটি নিম্নরূপ:
খুলনা বিভাগ: এই বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতেই জয় পেয়েছে জামায়াত। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গার সবকটি আসনে তাদের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।
রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ: রংপুরের ৩৩টি আসনের মধ্যে ১৬টি এবং রাজশাহীর ৩৯টি আসনের মধ্যে ১১টিতে তারা জয়ী হয়েছে। কুড়িগ্রাম ও রংপুরের সবকটি আসনে জোটগতভাবে জয় নিশ্চিত করেছে দলটি।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ: ঢাকার ৭০টি আসনের মধ্যে ৮টি এবং চট্টগ্রামের ৫৮টি আসনের মধ্যে ৩টিতে জামায়াত এককভাবে জয়ী হয়েছে। তবে সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে কেবল তাদের জোটের শরিক খেলাফত মজলিস একটি আসনে জয় পেয়েছে।
রাজধানীর রাজনীতিতে নতুন অবস্থান
অতীতে ঢাকা মহানগরে জামায়াতের কোনো প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও এবার তারা চমকপ্রদ ফল করেছে। ঢাকা-৪, ৫, ১২, ১৪, ১৫ ও ১৬—এই ৬টি আসনে জামায়াত প্রার্থীরা সরাসরি জয়ী হয়েছেন। এছাড়া তাদের জোটের শরিক এনসিপির প্রার্থী ঢাকা-১১ আসনে জয়লাভ করেছেন। আরও পাঁচটি আসনে (ঢাকা-৭, ৮, ১০, ১৩ ও ১৭) তারা সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে, যা রাজধানীতে দলটির শক্তিশালী উপস্থিতির প্রমাণ দেয়।
সাফল্যের নেপথ্য কারণ ও সমীকরণ
নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই উত্থানের পেছনে কয়েকটি বিশেষ দিক কাজ করেছে:
১. তরুণ ও নারী ভোটার: ধারণা করা হচ্ছে, তরুণ ও নারী ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবার জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের সাফল্য এই পরিবর্তনের একটি পটভূমি হিসেবে কাজ করেছে। এছাড়া গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের নতুন দল এনসিপির সঙ্গে তাদের নির্বাচনী জোট এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
২. আদর্শিক বিবর্তন: বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াত নিজেদের রক্ষণশীল ডানপন্থী অবস্থান থেকে সরিয়ে মধ্য-ডানপন্থী দল হিসেবে তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়েছে। আগে যে ভোটগুলোকে বিএনপির একক আমানত মনে করা হতো, এবার জামায়াত সেই জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী ঘরানার ভোটে বড় ধরনের ভাগ বসাতে সক্ষম হয়েছে। নিজেদের ক্ষমতার চেয়ে পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে প্রচার করাও তরুণদের আকৃষ্ট করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
৩. রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: বিএনপির পক্ষ থেকে এই ফলাফলকে ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের মতে, দীর্ঘ সময় দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশের অনুপস্থিতি এবং বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়নের ফলে এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাদের ধারণা, মানুষের কণ্ঠ রোধ করা হলে এ ধরনের শক্তির উত্থান ঘটে এবং এর জন্য গত পনের বছরের শাসনব্যবস্থাকেই দায়ী করছেন তারা।




