আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারসাম্যের বার্তা

0
7

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নবনির্বাচিত সরকারের শপথগ্রহণ মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শেষে গণরায়ের ভিত্তিতে গঠিত এ সরকারকে ঘিরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি আঞ্চলিক সম্প্রীতি, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত বহন করছে।

শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ—উভয়ের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি থাকায় ব্যক্তিগতভাবে শপথ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবুও দুই দেশের প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণকে কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের অনুপস্থিতি সত্ত্বেও প্রতিনিধিত্বের স্তর ও বার্তাই এখানে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্বকে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বাংলাদেশের অন্যান্য দেশের সঙ্গে ধারাবাহিক বন্ধুত্বের পুনর্ব্যক্তি বলে মন্তব্য করেছেন।

ভারতের পক্ষ থেকে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিস্ত্রি। ভারতের কূটনৈতিক সূত্র জনকণ্ঠকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস নোটে ভারত ও বাংলাদেশের জনগণের গভীর ও ঐতিহাসিক বন্ধনের প্রতিফলন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক বহুমাত্রিক। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় দুই দেশের সম্পৃক্ততা ক্রমবর্ধমান। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, সংযোগ অবকাঠামো, জ্বালানি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—এসব ক্ষেত্রে উভয় দেশ পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে কাজ করে আসছে। ফলে শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্বকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি হিসেবেই মূল্যায়ন করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

পাকিস্তানের পক্ষে পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও বিশেষ উদ্যোগবিষয়ক ফেডারেল মন্ত্রী এহসান ইকবাল অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যে পরিবর্তন এসেছে, তার আলোকে বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্কেও বাস্তববাদী যোগাযোগ বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ অস্ট্রিয়ার ফেডারেল চ্যান্সেলর ক্রিস্টিয়ান স্টোকারের আমন্ত্রণে ১৫–১৬ ফেব্রুয়ারি ভিয়েনা সফরে রয়েছেন। সফরকালে তিনি পাকিস্তান–অস্ট্রিয়া বিজনেস ফোরামে অংশ নেবেন এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি’র সঙ্গে বৈঠক করবেন। সফরটি দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, একই সময়ে একাধিক কূটনৈতিক কর্মসূচিতে সম্পৃক্ততা দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন।

শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্য ও গণমাধ্যমমন্ত্রী নালিন্দা জয়তিস্সা শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন। একইভাবে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লে. জেনারেল (অব.) বালা নন্দ শর্মার উপস্থিতির সম্ভাবনার কথা জানা গেছে। দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো—বিশেষত আঞ্চলিক বাণিজ্য, জলবায়ু সহনশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও জনগণ-জনগণ যোগাযোগ—এগুলোতে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতিনিধিত্বকে আঞ্চলিক সংহতির ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

একই সময়ে, ১৭–১৯ ফেব্রুয়ারি ভারতে সরকারি সফরে রয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে অনুষ্ঠিত এ সফরে ‘হরিজন ২০৪৭’ রোডম্যাপের আলোকে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, জ্বালানি রূপান্তর ও ইন্দো-প্যাসিফিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মুম্বাইয়ে ‘ইন্ডিয়া–ফ্রান্স ইয়ার অব ইনোভেশন ২০২৬’-এর উদ্বোধন এবং নয়াদিল্লিতে এআই ইমপ্যাক্ট সামিটে অংশগ্রহণ—এসব কর্মসূচি বৃহত্তর কৌশলগত অংশীদারত্বের বহিঃপ্রকাশ। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অঙ্গনে সমান্তরাল কূটনৈতিক তৎপরতা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সময়রেখাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্য

বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথকে কেন্দ্র করে যে বহুপাক্ষিক উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তা দেশের কৌশলগত অবস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার স্বীকৃতি বহন করে। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে সংযোগ, সমুদ্রসম্পদ, নীল অর্থনীতি, আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্য এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাস—এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠছে।

নবনির্বাচিত সরকারের জন্য পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় সক্রিয় ভূমিকাই হবে অগ্রাধিকার। কূটনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক জোরদার, বহুপাক্ষিক মঞ্চে সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে ফলপ্রসূ সম্পৃক্ততা—এই তিন অক্ষে আগামী দিনের কৌশল নির্ধারিত হতে পারে।

আজকের শপথ অনুষ্ঠান কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী মুহূর্ত। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিত্বমূলক উপস্থিতি পারস্পরিক সম্মান, সংলাপ ও সহযোগিতার ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিচ্ছে।

বাংলাদেশের নতুন সরকার আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির পক্ষে ইতিবাচক ও গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে—এ প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকরা। দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এ শপথ অনুষ্ঠান ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তি সুদৃঢ় করার এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here