ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির প্রভাব মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে ভারত। সমালোচকদের দাবি, এই চুক্তি ওয়াশিংটনের কাছে ‘আত্মসমর্পণ’।
মুম্বাই থেকে এএফপি জানায়, চলতি মাসে ঘোষিত চুক্তিটি বিশেষ করে ভারতের প্রভাবশালী কৃষক সংগঠনগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাদের আশঙ্কা, সস্তা মার্কিন পণ্য আমদানি হলে দেশীয় উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। ভারতে ৭০ কোটির বেশি মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত।
চুক্তির বিস্তারিত এখনো প্রকাশ হয়নি, শুধু একটি যৌথ বিবৃতি ও হোয়াইট হাউসের তথ্যপত্র প্রকাশিত হয়েছে। তবে নয়াদিল্লি জানিয়েছে, মার্চের শেষ নাগাদ একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে।
বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ অভিজিৎ দাস এএফপিকে বলেন, ‘ট্রাম্পের যুগে নিশ্চিত বলে কিছু নেই।’ তার মতে, চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও তা টিকবে কি না, তা নির্ভর করবে ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
সবচেয়ে বিতর্কিত প্রতিশ্রুতি হলো- সভারত আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার ‘ইচ্ছা’ প্রকাশ করেছে। অথচ গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতের আমদানি ছিল প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, বছরে আমদানি ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা ‘অবাস্তব’।
তিনি জানান, এ অঙ্গীকারের বড় অংশ বিমান কেনার সঙ্গে যুক্ত। তবে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর অতিরিক্ত বোয়িং বিমান কেনার সিদ্ধান্তও মোট লক্ষ্যপূরণে যথেষ্ট হবে না। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, পাঁচ বছরে ২০০টি বোয়িং বিমান কিনলেও (প্রতি বিমানের আনুমানিক মূল্য ৩০০ মিলিয়ন ডলার) মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ‘অঙ্গীকার’ নয় বরং ‘ইচ্ছা’ হিসেবে লক্ষ্য নির্ধারণ করায় নয়াদিল্লির ঝুঁকি কিছুটা কমেছে। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের শিভান ট্যান্ডন বলেন, লক্ষ্যকে বাধ্যবাধকতা না বানানোয় চুক্তি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা কমেছে।
আরেকটি বিতর্কিত বিষয় হলো- ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধে সম্মত হয়েছে বলে ওয়াশিংটনের দাবি। এর পর যুক্তরাষ্ট্র ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করে। তবে যৌথ বিবৃতিতে এমন কোনো প্রতিশ্রুতির উল্লেখ নেই এবং ভারত সরকারও বিষয়টি নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি।
ভারত বলছে, তাদের জ্বালানি নীতি জাতীয় স্বার্থনির্ভর এবং বিভিন্ন উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি রুশ তেল আমদানি করলেও জানুয়ারিতে তা কমে প্রায় ১১ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত রিফাইনারিগুলো এপ্রিলের জন্য ভেনেজুয়েলার তেল কেনা শুরু করেছে।
তবে রুশ তেল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। আংশিকভাবে রাশিয়ার রোজনেফটের মালিকানাধীন মুম্বাইভিত্তিক নায়ারা এনার্জি প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ব্যারেল তেল কেনা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা করছে বলে ব্লুমবার্গ জানিয়েছে।
বিএমআই (ফিচ সলিউশনসের একটি ইউনিট)-এর ড্যারেন টে বলেন, ‘নয়াদিল্লি প্রকাশ্যে পুরোপুরি বন্ধের কথা বলছে না এবং মূল্য ও প্রাপ্যতার ভিত্তিতে জ্বালানি সংগ্রহের কথা উল্লেখ করছে—এতে তেল ইস্যুতে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।’
তার মতে, ভারতীয় রিফাইনারিগুলো স্পট মার্কেটে রুশ তেল কেনা কমাচ্ছে, যা আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতির বদলে আংশিক সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়।
চুক্তিটি এখনো ‘ভঙ্গুর ও রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত। এ কারণে ভারতের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আনার মতো স্থিতিশীলতা এখনো তৈরি হয়নি ব্বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।




