নির্বাসন থেকে ফিরেই ৫৪ দিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

0
4

বয়স তখন মাত্র ছয় বছর। দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। বাবা জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। মা গৃহিণী খালেদা জিয়া দুই ছেলেকে নিয়ে ভীতসন্ত্রস্ত। নিরাপত্তার খোঁজে প্রথমে চট্টগ্রামের এক আত্মীয়ের বাসায়, এরপর ঢাকার নারায়ণগঞ্জে এবং সর্বশেষ সিদ্ধেশ্বরীতে আশ্রয় নেন তাঁরা। অবশেষে ১৯৭১ সালের ২ জুলাই দুই সন্তান তারেক ও কোকোসহ গ্রেপ্তার হন বেগম খালেদা জিয়া।

নিজ দেশে থেকেও সেই শৈশবেই ফেরারি জীবন এবং পরবর্তীতে কারাবাস করতে হয়েছে তারেক রহমানকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁকে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করতে হয়েছে। সর্বশেষ ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হন তিনি। ১৮ মাস কারাগারে থাকাকালে তিনি অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন, যার ফলে তাঁর মেরুদণ্ডের হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসার জন্য জামিন লাভ করে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে তিনি লন্ডনে পাড়ি জমান।

পরবর্তীতে শেখ হাসিনা সরকার তাঁর বিরুদ্ধে ডজনখানেক মামলা দায়ের করে এবং একটি মামলায় তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০০৮ সাল থেকেই তারেক রহমান নির্বাসিত জীবন অতিবাহিত করেন। শেখ হাসিনা সরকার তাঁকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনার নানা চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বীরের বেশে দেশের মাটিতে ফিরে আসেন।

সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থাকায় তিনি দ্রুত নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে পড়েন। তারেক রহমানের রাষ্ট্র সংস্কারের নানা প্রতিশ্রুতিতে দেশের মানুষ মুগ্ধ হয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপিকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে। ১৭ বছরের বেশি সময় পর দেশে ফিরে মাত্র ৫৪ দিনের মাথায় অভাবনীয় সাফল্য দেখালেন তিনি। ৫০ সদস্যের পুরো মন্ত্রিসভা সাজিয়েছেন তিনি নিজেই। দলের সিদ্ধান্তে তিনি প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হন এবং মঙ্গলবার বিকেল ৪টা ১২ মিনিটে বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব নিতে শপথ গ্রহণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে তাঁকে যেমন নির্বাসিত থাকতে হয়েছে, তেমনি প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে পরিবারের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের করুণ দৃশ্য। শেখ হাসিনার রোষানলে পড়ে বেগম খালেদা জিয়াকে দীর্ঘ সময় আদালতের বারান্দায় কাটাতে হয়েছে। ২০১৮ সালে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে জামিন পেলেও সুচিকিৎসার অভাবে খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়েছে বলে বিএনপি মনে করে। নির্বাসন থেকে ফেরার মাত্র ৫ দিনের মাথায় মাতৃহারা হন তারেক রহমান। এর আগে ২০১৫ সালে একমাত্র অনুজ আরাফাত রহমান কোকোকেও তিনি অকালে হারিয়েছেন। এমন এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই তিনি আজ দেশের হাল ধরেছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তারেক রহমান ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে ১৯৮০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। তবে ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। ১৯৯৪ সালে তিনি প্রাক্তন নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের কন্যা ডা. জোবাইদা রহমানকে বিয়ে করেন। তাঁদের একমাত্র সন্তান ব্যারিস্টার জাইমা জারনাজ রহমান।

নির্বাসিত ১৭ বছর ছিল বিএনপির ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়। এই সময়ে দলের হাল ধরে তিনি গণতান্ত্রিক আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে লাখো জনতার সংবর্ধনা সমাবেশে মার্টিন লুথার কিংয়ের ঐতিহাসিক উক্তির অনুকরণে তিনি বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ (আমার একটি পরিকল্পনা আছে)।’

তারেক রহমান ১৯৮৮ সালে ২২ বছর বয়সে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হওয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে আসেন। ২০০২ সালে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হন এবং ২০০৫ সালে দেশব্যাপী তৃণমূল সম্মেলনের মাধ্যমে দলকে শক্তিশালী করেন। কৃষকদের ভর্তুকি, বয়স্ক ভাতা এবং নারী শিক্ষার উন্নয়নে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপগুলো ব্যাপক প্রশংসিত হয়।

শৈশব থেকেই প্রতিকূলতাকে জয় করে বড় হওয়া তারেক রহমান আজ বাবা ও মায়ের পর নিজেই সরকার গঠন করলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তাঁর এই অভিষেক বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here