রাজনীতি-কূটনীতির সমীকরণ জামায়াতের উত্থান ঘিরে দিল্লির উদ্বেগ

0
6

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির উল্লেখযোগ্য আসন প্রাপ্তি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি ভারতের গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারণী মহলেও বিশ্লেষণের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্যের প্রশ্নে দিল্লিভিত্তিক কিছু সংবাদমাধ্যম সম্ভাব্য নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা বলছে। তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবতা আরও জটিল ও বহুস্তরীয়।
একটি দেশকে অন্য একটি দেশ নিয়মবহির্ভূত কোনো কিছু করার অধিকার রাখে না। প্রতিটি দেশই তাদের নিজেদের সরকারের কাছে জবাবদিহিতার মধ্যে থাকলে ভালো হয়। তবে এটাও সত্যি যে কোনো সরকার না চাইলে ভারতীয় মিডিয়াগুলো বাস্তবতা বিবর্জিত যা প্রচার করে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা  সরকারের  পক্ষে পুরোপুরি সম্ভব না হলেও কমানোর ব্যবস্থা করতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যা কম হচ্ছে। তবে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই্ উভয় দেশের সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে দুদেশের মধ্যে জোরাল কূটনৈতিক সম্পর্কের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
ভারতের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘ইন্ডিয়া টুডে’ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জামায়াতের ভালো ফলাফলকে ভারতের নিরাপত্তা হিসাবের জন্য সম্ভাব্য ‘অস্থিরতার উপাদান’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিশেষ করে অসম ও পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে তাদের প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ উঠে এসেছে।
একই সুরে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে টাইমস অব ইন্ডিয়া’। তাদের ভাষ্যে, দুই দশকের বেশি সময় পর জামায়াতের এটি অন্যতম বড় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন, যা সীমান্ত অঞ্চলে দলটির সাংগঠনিক শক্তি পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দেয়।
নিউজ ১৮ ও অব ইন্ডিয়া’র বিশ্লেষণে দলটির আদর্শিক অবস্থান ও অতীত রাজনৈতিক ইতিহাস সামনে এনে বিষয়টি উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা প্রেক্ষাপটে দেখা হয়েছে। অন্যদিকে হিন্দুস্তান টাইমস তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনায় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সামাজিক সংহতি, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরেছে। বার্তা সংস্থা এএনআইও বিষয়টিকে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেছে। সব মিলিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে আলোচনার মূল সুর, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থে কী প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘ স্থল সীমান্ত। লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সাতক্ষীরার মতো জেলা ঐতিহাসিকভাবে সীমান্তপাচার, অনুপ্রবেশ ও সহিংসতার আলোচনায় এসেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, যাকে ‘সেভেন সিস্টারস’ বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরেই বিচ্ছিন্নতাবাদ ও নিরাপত্তা ইস্যুতে স্পর্শকাতর। ফলে বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলে যে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন দিল্লির নজরে থাকবে-এটি অস্বাভাবিক নয়।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত রাজনীতির বাস্তবতা কেবল দলীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না। প্রশাসনিক সমন্বয়, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও আস্থাভিত্তিক সহযোগিতাই এখানে মুখ্য।
ভারতীয় মিডিয়ার কিছু আলোচনায় জামায়াতের অতীত আদর্শিক অবস্থান ও ১৯৭১পরবর্তী ইতিহাসের প্রসঙ্গ এসেছে। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রনীতিতে কেবল আদর্শ নয়, কার্যকর নীতি ও প্রশাসনিক আচরণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলছেন বিশ্লেষকেরা।
গত এক দশকে বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বিদ্রোহ দমনে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করেছে। নিরাপত্তা সহযোগিতার এই ধারাবাহিকতা দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কে আস্থার ভিত্তি তৈরি করেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও এই কাঠামো অব্যাহত থাকবে কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক ইমতিয়াজ আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, “ভারতীয় গণমাধ্যমে যা বলা হচ্ছে, তা নিয়ে বাংলাদেশের অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। ভারত তাদের দেশে কী বলবে, সেটি তাদের বিষয়। পত্রিকার বিশ্লেষণকে রাষ্ট্রীয় অবস্থান মনে করা ঠিক নয়।”
তিনি আরও বলেন, জামায়াত একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এবং নির্বাচনে তাদের সাফল্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। “রাজনৈতিক উত্থান-পতন স্বাভাবিক বিষয়। এটিকে ভয় বা আতঙ্কের কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই”।
তার মতে, অনেক সময় নিরাপত্তাসংক্রান্ত মন্তব্য কৌশলগত বার্তার অংশও হতে পারে। উগ্রবাদী ঝুঁকির যে কথা বলা হচ্ছে, তার পক্ষে দৃশ্যমান কোনো প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি।

বিএনপি-জামায়াত সমীকরণ ও দিল্লির কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে ঘিরে দিল্লি বাস্তববাদী কূটনৈতিক অবস্থান নিতে পারে। ভারত ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে দলনির্বিশেষে কাজ করেছে। কৌশলগত স্বার্থ, বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, নদী ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক সংযোগ এসব ক্ষেত্র দুই দেশকেই বাস্তববাদী হতে বাধ্য করে।
একজন সাবেক কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “দিল্লি কখনোই একক কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি নীতি নির্ধারণ করে না। তারা দেখবে নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত থাকে কি না, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কার্যকর থাকে কি না, এবং আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পগুলো এগোয় কি না।”
তার মতে, রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বাস্তব পদক্ষেপই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। “যদি প্রশাসনিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা সমন্বয় অব্যাহত থাকে, তবে দিল্লির উদ্বেগ ধীরে ধীরে প্রশমিত হবে।”
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার। বিদ্যুৎ আমদানি, ট্রানজিট সুবিধা, রেল ও সড়ক সংযোগ, সমুদ্রবন্দর ব্যবহার এসব খাতে পারস্পরিক নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। উপ-আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প ও জ্বালানি সহযোগিতাও দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত গভীরতা দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক সম্পর্ক যত গভীর হয়, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের প্রভাব তত সীমিত হয়ে আসে। বাস্তব অর্থনৈতিক স্বার্থই শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের গতি নির্ধারণ করে।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঢাকা ও দিল্লির সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা সমন্বয় জোরদার করা, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও মানবাধিকার ইস্যুতে স্বচ্ছতা বজায় রাখা, মিডিয়া বয়ান ও সরকারি কূটনীতির মধ্যে ভারসাম্য রাখা এবং আস্থা বৃদ্ধিমূলক পদক্ষেপ জোরদার করা।
বিশ্লেষকদের মতে, গণমাধ্যমের বক্তব্য অনেক সময় রাজনৈতিক বার্তা বহন করে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক নির্ধারিত হয় কূটনৈতিক চ্যানেলে। প্রতিবেশী দেশের উদ্বেগ অস্বাভাবিক নয়; তবে তা একতরফা ব্যাখ্যা বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধানযোগ্য নয়।
অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, নিজস্ব স্বার্থ ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়া। কে কী বলল, সেটিতে অতিরিক্ত মনোযোগ দিলে কৌশলগত ফোকাস নষ্ট হয়।”
ঢাকা ও দিল্লির সামনে এখন বড় দায়িত্ব আদর্শিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে বাস্তববাদী কূটনীতি জোরদার করা। নিরাপত্তা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি- এই তিন স্তম্ভই হতে পারে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় যে কোনো রাজনৈতিক শক্তির উত্থান অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার ফল। সীমান্তের রাজনীতি স্পর্শকাতর হলেও আঞ্চলিক শান্তি ও উন্নয়নের স্বার্থে দুই দেশের সম্পর্ককে স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখা সময়ের দাবি।
শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রনীতি আবেগ নয়, স্বার্থ ও বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে এগোয়। দিল্লির উদ্বেগ ও ঢাকার বাস্তবতার এই সমীকরণ কোথায় গিয়ে স্থির হবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের নেতৃত্বের পরিমিতি, কৌশল ও পারস্পরিক আস্থার ওপর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here