বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনের তারকারা শুধু অভিনয়, গান বা উপস্থাপনায় নয়, মানবিক কাজ এবং সামাজিক উদ্যোগেও রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। পর্দার ঝলমলে আলো ছাড়িয়ে বাস্তব জীবনে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই প্রবণতা গত এক দশকে আরও দৃশ্যমান হয়েছে। দুর্যোগ, চিকিৎসা সহায়তা, শিক্ষা, শিশু ও নারী উন্নয়ন-বিভিন্ন খাতে অনেক তারকা নীরবে-নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশের বিনোদন অঙ্গনের তারকাদের মধ্যে প্রকাশ্যে সবচেয়ে বেশি সামাজিক কর্মকা-ে অংশ নিয়েছেন প্রখ্যাত অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর তিনি গড়ে তোলেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতা তৈরি, আইন প্রয়োগের দাবি ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার এ উদ্যোগ শুধু তারকাখ্যাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
মানবিক সহযোগিতার অন্যতম এক তারকা দম্পতি হচ্ছেন অনন্ত জলিল ও বর্ষা। এ তারকা দম্পতি সিনেমায় অভিনয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কাজের জন্য সুপরিচিত। অনন্ত জলিল নিজস্ব অর্থায়নে এতিমখানা প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন, যেখানে অনাথ শিশুরা আশ্রয় ও শিক্ষার সুযোগ পায়। এ ছাড়া এ দম্পতি করোনাকালীন দুস্থদের সাহায্য, বর্ষাকালে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি বছরের বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে শীতকালে বা ঈদে, বস্ত্রহীন ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সাহায্য করেন। পোশাকশিল্প (গার্মেন্টস) ব্যবসায়ী হিসাবে হাজারও কর্মীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার মাধ্যমেও তারা সামাজিক উন্নয়ন ও মানুষের জীবিকায় অবদান রাখছেন। তারা মূলত ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক কাজগুলো পরিচালনা করে থাকেন।
সংগীতশিল্পী তাহসান দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমে যুক্ত। শিক্ষা ও শিশু অধিকার নিয়ে তিনি কাজ করেছেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে। তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচক চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করতে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। একইভাবে প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুও জীবদ্দশায় নানা মানবিক কর্মকা-ে যুক্ত ছিলেন এবং অসংখ্য নতুন শিল্পীকে সহযোগিতা করেছেন, যা এক ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় বহন করে।
জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিম প্রায়ই মানবিক উদ্যোগে সম্পৃক্ত হন। তিনি সরাসরি প্রচারের চেয়ে নীরবে সহায়তা করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। বিভিন্ন নাট্যশিল্পীর চিকিৎসা সহায়তা এবং অসচ্ছল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে তার নাম শোনা যায়। চিত্রনায়িকা বিদ্যা সিনহা মিম ইউনিসেফ বাংলাদেশের জাতীয় দূত হিসাবে শিশু অধিকার ও নারী সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ মানবিক কাজ করছেন। তিনি কোভিড-১৯ সচেতনতা, টিকা কার্যক্রম এবং বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণ ও নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে সরাসরি কাজ করেছেন। এ ছাড়া তিনি নারী ও শিশু সহিংসতা বন্ধে সামাজিক মাধ্যমে সোচ্চার।
মিম তার কাজ ও জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে সুবিধাবঞ্চিত নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে ইউনিসেফের সঙ্গে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান অভিনয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কাজের জন্য পরিচিত। তিনি করোনাকালে বেওয়ারিশ কুকুরকে খাবার দেওয়া, পশুপাখির প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সোচ্চার ভূমিকা রাখা এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো কাজের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করেন নিয়মিত। অভিনয়ের মাধ্যমেই তিনি সমাজে নারীর অবস্থান, নিরাপত্তা ও সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেন।
চিত্রনায়িকা মৌসুমী অভিনয়ের পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক কর্মকা-ে সক্রিয়। তিনি তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘মৌসুমী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে অসহায়, এতিম ও দুস্থদের জন্য কাজ করেন। রমজান মাসে খাবার বিতরণ, শীতবস্ত্র বিতরণসহ বিভিন্ন সামাজিক দুর্যোগে তিনি আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসতে দেখা গেছে তাকে। তার স্বামী চিত্রনায়ক ওমর সানী তার এসব সামাজিক কাজে সহযোগী হিসাবে থাকেন। যদিও গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে মৌসুমী আমেরিকায় অবস্থান করছেন। ফলে সশরীরে তাকে আর এসব কর্মকা-ে দেখা যায় না।
অভিনেত্রী রাফিয়াত রশিদ মিথিলা পাশাপাশি মূলত একজন নিবেদিতপ্রাণ উন্নয়নকর্মী ও শিশু উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ। তিনি ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের ‘হেড অফ আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট’ হিসাবে আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা, প্লে-ল্যাব মডেল ও শিশু অধিকার নিয়ে গত ১৭ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন। এ ছাড়া তাকে বিভিন্ন সময় এতিমখানা, মসজিদ এবং বন্যার্ত ও গৃহহীন মানুষের সাহায্যার্থে অনুদান প্রদানসহ সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমে অংশ নিতে দেখা গেছে।




