নতুন গভর্নর সফল হবেন তো!

0
4

ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে সরকার একজন ব্যবসায়ীকে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দিয়েছেন। ইতোমধ্যে তিনি কাজে যোগদানও করেছেন। বিভিন্ন মহল থেকে শুভেচ্ছাও পাচ্ছেন ভূরিভূরি। এ সিদ্ধান্তে দেশের ব্যবসায়ী মহল বেজায় খুশি। প্রথা ভেঙ্গে নিজেদের লোককে পেয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আর্থিক নিয়ন্ত্রকের চেয়ারে। অপক্ষোকৃত কম পরিচিত হওয়ার সুবিধাটাও পাচ্ছেন নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। মাঠে তার তেমন কোনো বদনাম নেই।
ঋণ পুনঃতফসিলিকরণের যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, সেটিও ধোপে টিকছে না। কারণ, ব্যবসায়ীরা তো ঋণ নেবেনই। আর পুনঃতফসিল তো ঋণেরই একটি চিরাচরিত প্রক্রিয়া। কিন্তু এত কিছুর পরও দেশের ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ এবং নাগরিক মহলে তাকে ঘিরে কৌতূহলের শেষ নেই। সর্বত্রই একই প্রশ্ন নতুন গভর্নর শেষ পর্যন্ত সফল হবেন তো? তিনি কি পারবেন ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলতে?
জনমনে এমন কৌতূহলের প্রধান কারণ নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার কিংবা সরকারি আমলা নন। তিনি একজন ব্যবসায়ী, যাদের অতীতে কখনোই গভর্নর করা হয়নি। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো ব্যবসায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হলেন। ১৯৭২ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে সব সময় অর্থনীতিবিদ, আমলা অথবা পেশাদার ব্যাংকাররাই আসীন ছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, অর্থনীতিবিদ ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ফখরুদ্দীন আহমদ ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্বও পালন করেছিলেন। আরেক সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ সদ্য বিদায়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারই ২০২৪ সালের আগস্টে ব্যাংক খাত সংস্কারের কঠিন দায়িত্ব দিয়ে আইএমএফের সাবেক অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুরকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়।
নবনিযুক্ত গভর্নরকে নিয়ে সবচেয়ে বড় কৌতূহল তৈরি হয়েছে দুর্নীতিবিরোধী ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কাজ করা আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি বিবৃতি। বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো ওই বিবৃতিতে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তোলেন, নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিল করা ব্যবসায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে কতটা নির্মোহ হবেন? বিবৃতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর স্বার্থের দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে কতটা স্বাধীনভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারবেন এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি।

নিজ প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিল করা একজন ব্যবসায়ী কর্পোরেট স্বার্থের প্রভাবমুক্ত হয়ে মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিতে গভর্নর হিসেবে কতটা নির্মোহভাবে দায়িত্বপালন করতে পারবেন এই প্রশ্নও উত্থাপন করছে সংস্থাটি। টিআইবির আশঙ্কা, দেশের ইতিহাসে প্রথম ব্যবসায়ী হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে অভূতপূর্ব এ নিয়োগের মাধ্যমে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাস্তবে আবারও কর্তৃত্ববাদী চৌর্যতন্ত্রের আমলের মতো জাতীয় স্বার্থের তুলনায় খেলাপিঋণ ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতানির্ভর ব্যবসায়ী লবির করায়ত্ত ও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হলো।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নবনিযুক্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের ব্যাংকিং খাতে অভিজ্ঞতা মূলত ঋণগ্রস্ত থেকে ঋণখেলাপি ও পরবর্তীতে বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ প্রক্রিয়া সংক্রান্ত। এছাড়া, তৈরি পোশাক শিল্প, আবাসন, অ্যাটাব, ঢাকা চেম্বার্সের মতো প্রভাবশালী ব্যবসা লবির অংশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে নতুন গভর্নরের। কর্তৃত্ববাদী চৌর্যতন্ত্রের আমলে খাদে পড়া ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি করে নিয়োগপ্রাপ্ত নতুন গভর্নর ব্যবসায়ী লবি, ঋণগ্রস্ত ও ঋণখেলাপি মহলের প্রভাবমুক্ত থেকে কতটা স্বাধীনভাবে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন? বিশেষ করে, যেখানে সংসদ সদস্যদের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং মন্ত্রিপরিষদের ৬২ শতাংশের মূল পেশা ব্যবসা।

সংসদ সদস্যদের প্রায় ৫০ শতাংশ ঋণগ্রস্ত উল্লেখ করে টিআইবি নির্বাহী বলেন, যাদের মোট আদায়যোগ্য ঋণের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে, সেখানে একজন ঋণগ্রস্ত ব্যবসায়ী, যার বিশেষ বিবেচনায় ঋণ পুনঃতফসিলি করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং যিনি তৈরি পোশাক শিল্প ও রিহ্যাবের মতো খাতে নীতি দখলের সুবিধাভোগী, এমন একজনকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগের প্রভাব ব্যাংক খাতের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, সার্বিকভাবে এ নিয়োগের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে কী বার্তা দিচ্ছে? তা সরকারকে ভেবে দেখার অনুরোধ করছি,’ বলা হয় বিবৃতিতে।
মোস্তাকুর রহমানের এই নিয়োগ প্রসঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ, গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন নাগরিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের মতে, এ নিয়োগ কেবল একটি চমকপ্রদ উত্থান নয়, বরং এটি এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন নাগরিকদের সমানভাবে বিস্মিত করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দেশের আর্থিক খাত নিয়ে কাজ করা একজন সিনিয়র সাংবাদিক নাম প্রকাশে অনাগ্রহ জানিয়ে বলেন, বুধবার দুপুরে খবর আসে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, নতুন গভর্নর হচ্ছেন মো. মোস্তাকুর রহমান নামের একজন। এ তথ্য ছড়িয়ে পড়তেই ঢাকার বিভিন্ন সংবাদকক্ষে তৈরি হয় এক ধরনের বিভ্রান্তি।

তথ্যপ্রবাহের এই ব্যস্ত জগতে যেন আচমকাই ঘনিয়ে আসে অনিশ্চয়তার মেঘ। সাংবাদিকদের মনে তখন ঘুরপাক খাচ্ছিল একটিই প্রশ্ন কে এই মোস্তাকুর রহমান? শুরুতে গুঞ্জন ওঠে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এক বাংলাদেশি অর্থনীতি অধ্যাপকই নাকি আহসান এইচ মনসুরের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হতে নিউজরুমের সহকর্মীরা গুগলে নামটি লিখে দ্রুত অনুসন্ধান শুরু করেন। কিন্তু কথিত সেই অর্থনীতি অধ্যাপকের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে, নতুন গভর্নরকে ঘিরে তৈরি হয় আরও বেশি রহস্য ও অনিশ্চয়তা। অনেক সাংবাদিক ভেবেছিলেন, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) পরিচালক মোস্তাকুর রহমানকে পরবর্তী গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অনেকে তাকে অভিনন্দন জানাতে শুরু করেন।

এমনকি বেশ কিছু গণমাধ্যম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই বিএফআইইউ কর্মকর্তার ছবিসহ পোস্ট দিয়ে তাকে নতুন গভর্নর হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। বিকেলের দিকে ধোঁয়াশা কেটে যায়। তখন জানা গেল, কোনো অর্থনীতিবিদ বা আমলা নন, বরং পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হেরা সোয়েটার্সের সিইও মো. মোস্তাকুর রহমানই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাল ধরছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, গতানুগতিক ধারা ভেঙে একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর নিয়োগ করায় ব্যাংকিং খাতের সুরক্ষা ও সুশাসন নিশ্চিতে ইতোমধ্যে গৃহীত পদক্ষেপ ও কার্যক্রমগুলো কতটা বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কারণ, ব্যবসায়িক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং ব্যক্তিস্বার্থ সংরক্ষণকারী দুর্বল ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে তিনি আদৌ কি স্বাধীন ও নির্মোহভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন?

তাদের মতে, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের যে জনআকাক্সক্ষার সৃষ্টি হয়েছে, তার মধ্যে একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা অন্যতম। এক্ষেত্রে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নরের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকার দলীয় ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী স্বার্থের বাইরে গিয়ে কতটা স্বাধীনভাবে সার্বিক ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রণ ও সহায়কের ভূমিকা পালন করতে পারবে সে প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here