খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রভাবে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দেশে আবারও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এতে নতুন সরকারের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ একটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বৃহস্পতিবার পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের প্রকাশিত সর্বশেষ অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
জিইডির প্রকাশিত ‘ইকোনমিক আপডেট অ্যান্ড আউটলুক, ফেব্রুয়ারি ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ডিসেম্বরের ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে বেড়ে জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে আশার কথা হলো, চালের মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। নভেম্বরে ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ থাকলেও জানুয়ারিতে তা নেমে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৬১ শতাংশে। এই হ্রাস মূলত মাঝারি, মোটা ও চিকন সব ধরনের চালের দাম কমার ফল। কিন্তু চালের দামের এই পতন সত্ত্বেও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি উচ্চ থাকার মূল কারণ শাকসবজি, মাছ ও ফলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি।
জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে সবজির অবদান আগের মাসের নেতিবাচক অবস্থান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ ইতিবাচক অবদান রাখে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়া এবং ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতাকে এর জন্য দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া মাছ ও শুঁটকি, ফল ও ভোজ্যতেলের দামও উচ্চ থাকায় খাদ্যপণ্যের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী মজুরি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যে ব্যবধান বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় চাপে পড়ছে। গত সেপ্টেম্বর থেকে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ০১ থেকে ৮ দশমিক ০৮ শতাংশের মধ্যে স্থির থাকলেও মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ১৭ থেকে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। জানুয়ারিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতি যেখানে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ, সেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার মাত্র ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ। এই ব্যবধান নি¤œ আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সরকারের রাজস্ব আদায়ের চিত্রও সন্তোষজনক নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সংশোধিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। জানুয়ারি মাসের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা। কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আদায় করতে পেরেছে মাত্র ৩৭ হাজার ৩৩ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৫ হাজার ৫১২ কোটি টাকা কম। আমদানি-রপ্তানি শুল্ক, স্থানীয় ভ্যাট ও আয়কর খাতে এই ঘাটতি দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি সময়ে সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৮১ শতাংশ।
এদিকে সরকারের উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের গতিও মন্থর রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় মাত্র ২১ দশমিক ১৮ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে। গত পাঁচ বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি সবচেয়ে কম বাস্তবায়ন হার। সরকারি অর্থায়ন খাতে ব্যয়ের হার ৪৪ দশমিক ১২ শতাংশ হলেও প্রকল্প সাহায্য খাতে ব্যয়ের হার মাত্র ২১ দশমিক ৭১ শতাংশ, যা বহিঃসহায়তা নির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির ইঙ্গিত দেয়।
তবে বৈদেশিক খাতে কিছু ইতিবাচক প্রবণতাও দেখা গেছে। নভেম্বরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার। জানুয়ারি শেষে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভও বেড়ে হয়েছে ২৮ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার।
প্রবাসী আয়ের প্রবাহও শক্তিশালী রয়েছে। জানুয়ারি মাসে দেশে ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। গত বছরের জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স ছিল ২ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। রমজান উপলক্ষে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
রপ্তানি খাতেও প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি জানুয়ারিতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলারে। অ-পোশাক খাতের রপ্তানিও বেড়ে ৭৯৮ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তবে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়া ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অক্টোবরে যেখানে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ছিল ৪১২ মিলিয়ন ডলার, নভেম্বরে তা কমে ১৮৬ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ডিসেম্বরে কিছুটা বেড়ে ২৩২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়ালেও আগের তুলনায় তা এখনো কম। বিশ্লেষকদের মতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়া বিনিয়োগ কার্যক্রমে স্থবিরতার ইঙ্গিত দেয়, যা ভবিষ্যৎ উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিনিময় হারেও কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখা গেছে। প্রকৃত কার্যকর বিনিময় হার নভেম্বরের তুলনায় কমে জানুয়ারিতে দাঁড়িয়েছে প্রতি ডলারে ১২৪ দশমিক ৬৪ টাকা। অন্যদিকে ডলার বিনিময় হার গত কয়েক মাস ধরে ১২১ দশমিক ৭১ থেকে ১২২ দশমিক ৩২ টাকার মধ্যেই রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন সরকারকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার এবং সুশাসন নিশ্চিত করাও বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।




