ইতিহাস গড়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ভারত

0
6

রীতিমতো ইতিহাস গড়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের মুকুট পরল ভারত। একতরফা ফাইনালে ৯৬  রানের বিশাল জয়ের পথে নিউজিল্যান্ডকে স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছে সূর্যকুমার যাদবের দল। টি২০ বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম দল হিসেবে টানা দুটিসহ সর্বাধিক তিনটি শিরোপা জিতল মোড়ল দেশটি। রবিবার আহমেদাবাদের নরেদ্র মোদি স্টেডিয়াম ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। সাঞ্জু স্যামসন, অভিশেক শর্মা, ইশান কিষানদের ব্যাটিং তাণ্ডব গ্যালারিতে ঢেউ তোলেন। টানা তিন ম্যাচে অবিশ্বাস্য স্যামসন ৪৬ বলে করেছেন ৮৯ রান। ৫ চারের বিপরীতে ছক্কা হাঁকিয়েছেন ৮টি! ব্যাডপ্যাঁচ কাটিয়ে মোক্ষম সময়ে জ্বলে উঠেছেন অভিশেক। ২১ বলে ৬ চার ও ৩ ছক্কায় ২৪৭.৬১ স্ট্রাইক রেটে খেলেছেন ৫২ রানের টর্নেডো ইনিংস! সঙ্গে ওয়ানডাউনে ইশান কিষানেরর ২৫ বলে ৪ চার ও ৪ ছক্কায় ৫৪। ২০ ওভারে ৫ উইকেটে সূর্যদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৫৫ রান। ফাইনালে যা সর্বোচ্চ দলীয় রানের নতুন রেকর্ড। জবাবে ১৯ ওভারে ১৫৯ রানে অলআউট মিচেল স্যান্টনারের নিউজিল্যান্ড যেন হারার আগে হেরে গেল। অসম্ভব লক্ষ্য তাড়ায় ন্যূনতম প্রতিরোধটুকু গড়তে পারেনি নিউজিল্যান্ড। টিম সেইফার্টের ফিফটি বাদ দিলে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে কিউই ব্যাটিং। ২৬ বলে ২ চার ও ৫ ছক্কায় সর্বোচ্চ ৫২ রান করা ওপেনারকে ফিরিয়েছেন বরুন চক্রবর্তী। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অতিমানবীয় সেঞ্চরিতে দলকে ফাইনালে তোলা ফিন অ্যালেন আউট হন ৯ রান করে। রাঁচীন রবীন্দ্র ১, গ্লেন ফিলিপস ৫, মার্ক চাপম্যান ৩! অষ্টম ওভারে দলীয় ৭২ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে হারের প্রহর গুনতে থাকে কিউইরা! শেষদিকে অধিনায়ক স্যান্টনারের ৩৫ বলে ৪৩ রানের ইনিংসটা কেবল হারের ব্যবধানই কিছুটা কমিয়েছে। দুর্দান্ত বোলিংয়ে ৪ ওভারে মাত্র ১৫ রান দিয়ে ৪ উইকেট নিয়েছেন পেসার জাসপ্রিত বুমরাহ। অক্ষর প্যাটেলের শিকার ৩টি। হার্দিক পান্ডিয়া ও বরুন চক্রবর্তী ১টি করে। এর আগেসেমিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যেখানে শেষ করেছিল টসে হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে ঠিক সেখান থেকেই এদিন শুরু করেন ভারতীয় ব্যাটাররা। রানের খাতা খেলে ছক্কা দিয়ে। ম্যাট হেনরির করা প্রথম ওভারের পঞ্চম বলটাকে উড়িয়ে সীমানা ছাড়া করেন স্যামসন। তাঁর ছক্কাটাই পুরো ইনিংসে ভারতের প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকল। সেই শুরুর পর ইনিংসজুড়ে প্রতিপক্ষ বোলারদের শাসন করেছে ভারতীয় ব্যাটাররা। নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামের লক্ষাধিক দর্শককে আনন্দে মাতিয়ে এদিন ইনিংসজুড়ে সমানতালে প্রতিপক্ষকের ওপর তাণ্ডব চালিয়ে গেছে ভারতীয়রা। স্যামসন, অভিষেকের শুরুর ঝড়ের পর নিউজিল্যান্ডের বোলারদের বেধড়ক পিটিয়েছেন ইশান কিষান; তিনজনই পেয়েছেন ফিফটির দেখা। ফিফটি না করলেও কম যাননি শিবম দুবে। সব মিলিয়ে ফাইনালে নিজেদের ইনিংসে স্বাগতিক দর্শকদের শতভাগ ক্রিকেটীয় বিনোদন দিয়েছে ভারতীয় ব্যাটাররা। ৭.১ ওভারে উদ্বোধনী জুটিতে ভারতকে ৯৮ রান এনে দেন দুই ওপেনার অভিষেক ও স্যামসন। ২১ বলে ৫২ রান করে অভিষেক টিম শেইফার্টের হাতে ধরা পড়লে এই জুটি ভাঙে। তাতে অবশ্য তাণ্ডব থামেনি ভারতের।
দ্বিতীয় উইকেটে কিষানকে নিয়ে ১০৫ রান যোগ করেন স্যামসন। ৪৬ বলে ৫ চার ও ৮ ছক্কায় সর্বোচ্চ ৮৯ রানের ইনিংস উপহার দেন তিনি। সুপার এইটের শেষ ম্যাচে এবং সেমিফাইনালেও সেঞ্চুরির খুব কাছ থেকে ফিরেছেন স্যামসন। এবারও সেঞ্চুরির দেখা পাওয়া হলো না তার। তবে দলের স্কোর বোর্ডে বিশাল রান এনে দেওয়ার পথে সবচেয়ে বড় অবদান রাখতে পারায় সেঞ্চুরির না পাওয়ার হতাশা ভুলে যাওয়ার কথা স্যামসনের। মাত্র ৪৩ বলে ৯৮ রান করেন দুই ভারতীয় ওপেনার। যে পথে স্যামসন-অভিশেক ঝড়ে পাওয়ার প্লের ৬ ওভারেই আসে ৯২ রান। টি২০ বিশ্বকাপের ইতিহাসে পাওয়ার প্লেতে এটিই কোনো দলের সর্বোচ্চ রান। গত আসরে ব্রিজটাউনে আফগানিস্তানের বিপক্ষে এক উইকেট হারিয়ে ঠিক ৯২ রান করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। একই সঙ্গে নকআউট ম্যাচে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ডও গড়েছেন অভিষেক। মাত্র ১৯ বলেই তুলে নিয়েছেন অর্ধশতক, যা সেমিফাইনালে ফিন অ্যালেন ও জ্যাকব বেথেলের করা ১৯ বলের ফিফটির রেকর্ডের সঙ্গে সমান।  স্যামসনের পিছুপিছু প্যাভিলিয়নের পথ ধরেন কিষান। পান্ডিয়া (১৩ বলে ১৮ রান) ক্রিজে টিকলেও ইনিংস বড় করতে পারেননি।  ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল সূর্যকুমার (১ বলে ০)। শেষ দিকে সে প্রভাব টের পেতে দেননি দুবে। ৮ বলে ৩ চার ও ২ ছক্কায় ২৬ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। নিউজিল্যান্ডের হয়ে ৩ উইকেট নেন জেমস নিশাম। রান খরচে ঠিকই উদার ছিলেন; ৪ ওভারে ৪৬ রান দেন এই পেসার। রবীন্দ্র এবং হেনরির শিকার একটি করে উইকেট। এদিন বল হাতে সবচেয়ে বেশি রান বিলিয়েছেন হেনরি; ৪ ওভারে দেন ৪৯ রান। ৩ ওভার বল করা জ্যাকব ডাফির খরচ ৪২ রান।
২০০৭ সালে প্রথম বিশ্বকাপেই বাজিমাত করেছিল ভারত। জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে ৫ রানে হারিয়ে শিরোপা ঘরে তুলে মহেন্দ্র সিং ধোনির দল। ২০১৪ সালেও শিরোপা জয়ের সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু ফাইনালে উঠে শ্রীলঙ্কার কাছে হারতে হয়েছিল ৬ উইকেটে। এরপর টানা দশ বছর পর গেল বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে। কিন্তু এবার আর ভুল করেননি রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলির। ব্রিজটাউনের দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে পায় ৭ রানের নাটকীয় জয়। দ্বিতীয় শিরোপায় স্পর্শ করে ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের রেকর্ড। তিন শিরোপায় এবার ইতিহাস গড়ল সূর্যকুমার যাদবের দল। শুধু টানা দ্বিতীয় নয়, এর আগে নিজেদের মাটিতেও চ্যাম্পিয়ন হতে পারেন কোনো দেশ। অন্যদিকে  নিউজিল্যান্ড ২০২১ সালে একবারই ফাইনালে উঠে হারে অস্ট্রেলিয়ার কাছে। এবারও হতাশ করল কিউইরা। স্বপ্ন তো পূরণ হলোই না বরং দুঃস্বপ্নের এই ম্যাচটা তারা নিশ্চয়ই ভুলে যেতে চাইবে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here