মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রতিশ্রুত জ্বালানি তেলবাহী জাহাজগুলোর আগমন অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষায় বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছে সরকার। বিদ্যমান চুক্তির বাইরে গিয়ে সরাসরি ক্রয়, জি-টু-জি সমঝোতা এবং উন্মুক্ত দরপত্র– সব পদ্ধতিই এখন সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় আনা হয়েছে।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বর্তমানে আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের ৫০ শতাংশ সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) পদ্ধতিতে এবং বাকি ৫০ শতাংশ আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সংগ্রহ করে। জি-টু-জি চুক্তির আওতায় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত তেল এনে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে (ইআরএল) পরিশোধন করা হয়। এসব উৎসের মধ্যে রয়েছে– সৌদি আরামকোর অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড এবং আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির মুরবান ক্রুড।
কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে বাংলাদেশগামী জাহাজের সময়সূচি ভেঙে পড়েছে।
জ্বালানি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, মার্চ মাসে ১৭টি এলসি খোলা হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ছয়টি পার্সেল দেশে এসেছে। চারটি পার্সেল অপেক্ষায় এবং বাকি সাতটির কোনো নিশ্চয়তা নেই। এপ্রিলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ১৫টি এলসির বিপরীতে মাত্র তিনটি সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে। ফলে প্রতিশ্রুত জাহাজের ওপর নির্ভরতা এখন বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার জরুরি ভিত্তিতে নতুন উৎস থেকে তেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ইতোমধ্যে দুবাইভিত্তিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এক লাখ টন ডিজেল এবং ২৫ হাজার টন অকটেন আমদানির প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রতি ব্যারেলে প্ল্যাটস দামের সঙ্গে তিন ডলার প্রিমিয়ামে এই তেল সরবরাহের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা বিদ্যমান জি-টু-জি বা উন্মুক্ত দরপত্রের তুলনায় কম বলে বিবেচনা করছে সংশ্লিষ্টরা। এই আমদানিতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় দুই হাজার ৪৬ কোটি টাকা।
এর পাশাপাশি ভারত থেকে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান চুক্তি অনুযায়ী বছরে এক লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত থাকলেও প্রয়োজনে আরও ৬০ হাজার টন অতিরিক্ত আনার সুযোগ রয়েছে। পাইপলাইনের মাধ্যমে ইতোমধ্যে দুটি চালানে ১০ হাজার টন ডিজেল এসেছে। নতুন প্রস্তাবে মার্চে ২০ হাজার টন এবং এপ্রিলে ২৫ হাজার টন ডিজেল আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ছাড়া সমুদ্রপথে চারটি জাহাজে আরও এক লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল আমদানির প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।
একই সঙ্গে আফ্রিকা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকেও জ্বালানি আমদানির সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। বাজারে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিচ্ছে, তবে তাদের সক্ষমতা, গুণগত মান ও দামের বিষয়টি যাচাই-বাছাই করছে বিপিসি। রাশিয়ার কাছেও জ্বালানি সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অপরিশোধিত তেল আমদানির বিঘ্ন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। কারণ ইআরএলের উৎপাদন এই কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। অপরিশোধিত তেল সময়মতো না এলে দেশীয় উৎপাদন কমে যাবে এবং তখন বাধ্য হয়ে বেশি দামে পরিশোধিত তেল আমদানি করতে হবে। হরমুজ সংকটে অপরিশোধিত তেলের তিনটি জাহাজের আগমনে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় কূটনৈতিক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশগামী জাহাজ যাতে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারে, সে জন্য ইরানের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছে। ইরান ইতিবাচক আশ্বাস দিলেও বাস্তবে ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরবরাহকারীরা প্রাথমিক সম্মতি দিলেও বাস্তবে নির্ধারিত সময়ে তেল সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে চুক্তির বাইরে সরাসরি ক্রয়, বিশেষ অনুমোদনে আমদানি এবং উৎস বৈচিত্র্য সব কৌশল একসঙ্গে কাজে লাগাতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দামের চেয়ে সরবরাহ নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ডিজেল দেশের মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৭০ শতাংশ, যা পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে অপরিহার্য। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
জানতে চাইলে জ্বালানি সচিব সাইফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, এপ্রিলের জন্য প্রায় তিন লাখ টন ডিজেল আমদানির চেষ্টা চলছে। কোন দেশ থেকে আমদানি করা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সম্ভাব্য সব উৎস থেকেই জ্বালানি তেল সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে। যেখান থেকে পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই কেনা হবে। প্রয়োজনে ডিপিএমে (ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড) কেনা হবে।




