ঈদের তৃতীয় দিন সোমবারও রাজধানী ঢাকা অনেকটাই ফাঁকা রয়েছে। চিরাচরিত যানজট নেই। মহানগরীর রাস্তায় চলাচলকারী যানবাহনগুলোতে ভিড় নেই। অধিকাংশ দোকানপাটও এখনও খোলেনি। সর্বত্র এখনও ছুটির আমেজ বইছে। এরই মধ্যে ঈদের ছুটি কাটাতে গ্রামের বাড়ি যাওয়া অনেকেই ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছেন। তাদের বেশিরভাগ অবশ্য কর্মজীবী।
মঙ্গলবার থেকে যার যার কর্মস্থলে যোগ দিতে ফিরছেন তারা। অবশ্য বেশিরভাগের পরিবার-পরিজনের ঢাকায় ফিরবেন আরও কয়েক দিন পর।
এবার ঈদুল ফিতরের সরকারি ছুটি ছিল এক সপ্তাহ। ১৭ মার্চ শুরু হয়ে আজ সোমবার ছুটি শেষ হবে। প্রতি বছরের মতো এবারও বিপুল সংখ্যক মানুষ ঈদ কাটাতে ঢাকা ছাড়েন। ঘরমুখী মানুষ ঢাকা ছাড়ায় ফাঁকা হয়ে যায় রাজধানী। ঈদের তৃতীয় দিন সোমবারও সেটা বহাল রয়েছে।
সোমবার সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, যানজনটবিহীন ফাঁকা রাজধানীতে কিছু মানুষ ঈদের ঘোরাঘুরিতে সময় পার করছেন। সব বয়সের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরণীরা দল বেঁধে ঘুরতে বেরিয়েছেন। বিশেষ করে রাজধানীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে বেশ ভিড়। তবে রাস্তাঘাট এখনও প্রায় জনশূন্য। নগর পরিবহন ও মেট্রোরেলেও ভিড় নেই তেমন একটা।
মিরপুর থেকে সদরঘাটগামী বিহঙ্গ পরিবহনের চালক ইব্রাহিম শেখ জানালেন, গত তিনদিন ধরেই তাদের বাসগুলোতে যাত্রীর ভিড় নেই তেমন একটা। তারপরও সকাল থেকে রাত অবধি বাসগুলোর চলাচল অব্যাহত রেখেছেন। অবশ্য ট্রিপ সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে কিছুটা। এই রুটে চলাচলকারী অন্য পরিবহনের বাসগুলোসহ যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, রামপুরা, মৌচাক, মালিবাগ, ফার্মগেট, ধানমন্ডি এবং মোহাম্মদপুরসহ সব জায়গার বাস, সিএনজি ও লেগুনাসহ অন্য পরিবহনগুলোতেও একই চিত্র দেথা গেছে। অবশ্য তেল সংকটে ঢাকার অনেক পাম্প বন্ধ রাখতে দেখা গেছ।
অবশ্য ফাঁকা রাস্তায় ব্যাটারিচালিত ও সাধারণ রিকশা স্বাভাবিক সময়ের বেশি দেখা গেছে। সাধারণ ও দরিদ্র রিকশা চালকরা জীবিকার টানে ঈদের ছুটিতেই রাস্তায় বেরিয়েছেন। ঈদের উৎসব উপভোগে বের হওয়া মানুষের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া ও বখশিস পাচ্ছেন পরিবহন শ্রমিক ও রিক্সাচালকরা।
এদিকে, রাজধানীর মিরপুর, পল্টন, গুলিস্তান, ফার্মগেট, ধানমন্ডি, মতিঝিল ও যাত্রাবাড়ীসহ সব এলাকার বড়-ছোট শপিং মল ও দোকানপাটের বেশিরভাগ বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। এসব এলাকার বিভিন্ন ব্র্যান্ডের শোরুমের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বড় শপিংমল থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার অনেক দোকানেই তালা ঝুলতে দেখা গেছে। গুলিস্তান ও মতিঝিল এলাকার ফুটপাতের দোকানগুলোর বেশিরভাগ বন্ধ রয়েছে।
অবশ্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বিক্রেতা স্বপ্ন ও আগোরাসহ বড় কয়েকটি ব্রান্ডের বেশ কিছু শোরুম খোলা দেখা গেছে। ঈদের পরের প্রয়োজনীয় কেনাকাটায় এসে অনেকেই বিকল্প হিসেবে এসব শোরুমের ওপর নির্ভর করছেন।
একই দৃশ্য মহল্লার দোকানপাটগুলোতে। কোথাও কোথাও সীমিত পরিসরে দোকান খোলা থাকলেও ক্রেতা উপস্থিতি তেমন একটা নেই। কাচাবাজারগুলোর বেশিরভাগ খোলেনি। রাস্তাঘাটে ভ্রাম্যমাণ সবজির দোকানগুলো অবশ্য খোলা দেখা গেছে। সব দোকানপাট স্বাভাবিক পর্যায়ে খুলতে আরও দুই-একদিন সময় লাগবে বলে জানান বিক্রেতারা।
ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদের আগের টানা কয়েকদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিক্রি-বাট্টা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করতে হয়েছে। এই কারণে দোকানকর্মীদের ঈদের দিন থেকে ছয়-সাতদিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে। অনেকে আবার নিজ নিজ এলাকায় চলে যাওয়ায় কর্মী সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া ঈদের আগের ব্যস্ততা পার করে অধিকাংশ ব্যবসায়ীও এখনও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটাতে রাজধানী ছেড়েছেন। এই কারণে বেশিরভাগ শপিং মল ও দোকানপাট আরও কয়েক দিন বন্ধ থাকতে পারে।
শেওড়াপাড়া মধ্য পীরেরবাগ এলাকার কাপড় ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম জানান, ঈদের আগে বিক্রি ভালো হলেও এখন দোকান প্রায় ফাঁকাই থাকে। তার তিনজন কর্মী ছুটিতে রয়েছেন। তিনি ও তার ছোট ভাই মিলে সীমিত সময় দোকান চালাচ্ছেন।
ফিরতে শুরু করেছেন কর্মজীবীরা
ঈদ উৎসব শেষে আবারও ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছেন কর্মজীবীরা। ঈদের তৃতীয় দিন থেকে লঞ্চ, বাস ও ট্রেনে করে রাজধানীতে ফিরছেন এসব কর্মজীবী মানুষ। দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীদের ভিড় দেখা গেছে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালেও। তবে এখনও সিংহভাগ মানুষ ছুটি কাটাচ্ছেন যার যার বাড়িতে। মঙ্গলবার সকালে ঢাকায় ফিরে সরাসরি অফিস করার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। এছাড়া ঈদের পর বাড়তি ছুটি নিয়ে ঢাকা ছাড়া মানুষ স্বাধীনতা দিবসের ছুটি কাটিয়ে আগামী সপ্তায় কর্মস্থলে ফিরবেন বলেও জানিয়েছেন।
এবারের ঈদের ছুটি দীর্ঘ হওয়ায় এবারের ফেরা অনেকটা স্বস্তিদায়ক হয়েছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা। লম্বা সময় স্বজনদের সঙ্গে কাটাতে পেরে খুশি সবাই। জীবিকার তাগিদে আবারও নগরীতে ফিরতে হলেও কোনো ভোগান্তি ছাড়াই ঢাকায় পৌঁছাতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেন তারা।
অন্যদিকে, ঈদের তৃতীয় দিনেও থেমে নেই ঘরমুখো মানুষের যাত্রা। ঢাকায় পরিবারের সঙ্গে ঈদ করেও এখন আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি যাচ্ছেন কিছু মানুষ। ঈদের সময় যানজট ও নৌযান ভোগান্তির কথা মাথায় রেখে তারা ঈদের পর গ্রামের পথে রওনা দিয়েছেন বলে জানান।
সোমবার সকাল থেকে গাবতলী, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান ও মহাখালী বাস টার্মিনালসহ ঢাকার বাসস্ট্যান্ডগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দূরপাল্লার বাসগুলো যাত্রী নিয়ে ভিড়তে শুরু করে। উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গ থেকে আসা যাত্রীদের চাপ ছিল তুলানামূলক বেশি।
মহাখালী বাস টার্মিনালে ঈদের ছুটি কাটিয়ে ফেরা বেসরকারি চাকরিজীবী সোলায়মান আহমেদ জানান, পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটিয়ে ফিরতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু জীবিকার তাগিদে আসতেই হয়। মঙ্গলবার থেকে স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরতে হবে। পথে যানজট কম থাকায় ফিরতি যাত্রা বেশ আরামদায়ক ছিল।
কমলাপুর রেলস্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের ছুটি শেষে ধীরে ধীরে রাজধানীতে মানুষের ফেরা শুরু হয়েছে। আগামী কয়েকদিন যাত্রীচাপ আরও বাড়বে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা নদীবন্দরের সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে ঢাকায় ফেরা কর্মজীবী মানুষের কিছুটা ভিড় দেখা গেল। তবে এখনও তেমন একটা উপস্থিতি নেই। কর্মজীবীরা নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগ দিতে লঞ্চ থেকে নামছেন টার্মিনালের বিভিন্ন পয়েন্টে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) যুগ্ম পরিচালক মোবারক হোসেন মজুমদার জানান, মূলত লঞ্চগুলোর ফিরতি যাত্রা শুরু হবে স্বাধীনতা দিবসের ছুটি শেষে ২৮ মার্চ থেকে। সেদিন থেকে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিসের ফিরতি যাত্রাও শুরু হবে। তবে এখনও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নৌপথের কিছু যাত্রী ফিরছেন। ঈদযাত্রার মতো ফিরতি যাত্রাও স্বাচ্ছন্দ্যের করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন তারা।
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ভোলা থেকে ফেরা বেসরকারি চাকরিজীবী আমিনুল হক জানান, মঙ্গলবার থেকে তাদের অফিস খুলছে। এজন্য ভিড় এড়াতে একদিন আগেই ঢাকায় ফিরেছেন তিনি। তার অফিসের বাকিরা সোমবার রাতে রওয়ানা হয়ে মঙ্গলবার সকাল নাগাদ ঢাকায় আসতে পারেন।




