ট্রাম্পের দাবি আলোচনা চলছে, ইরান বলছে হচ্ছে না- সত্য কোনটা

0
5

প্রায় এক মাস ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর ভাষ্য, এ আলোচনায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও যুক্ত ছিলেন। তবে ট্রাম্পের এমন বয়ানের প্রধান সমস্যা হলো- ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা এটি বারবার অস্বীকার করছেন।

যুদ্ধের ডামাডোল এবং সব পক্ষের প্রোপাগান্ডার মাঝে কাকে বিশ্বাস করা যাবে তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে আলোচনা বা যুদ্ধবিরতি থেকে উভয় পক্ষ কী পেতে পারে- সেটি বিশ্লেষণ করা গেলে কিছু বিষয় স্পষ্ট হতে পারে।

শুরুতেই ট্রাম্পের মন্তব্যের ওপর নজর দেওয়া যাক। ইরানের একজন শীর্ষ নেতার (নাম উল্লেখ করেননি) সঙ্গে তিনি ‘খুব ভালো’ আলোচনার দাবি করেছেন। ওই আলোচনায় ঐকমত্যের মূল বিষয়গুলো নিয়েও কথা বলেছেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- যে সময়ে মার্কিন শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরু হয়; ট্রাম্প ঠিক সে মুহূর্তে ‘ফলপ্রসূ আলোচনার’ কথা বলেছেন। ইরানের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জন্য তিনি যে পাঁচদিনের সময়সীমা দিয়েছিলেন সেটিও কাকতালীয়ভাবে শেয়ারবাজারের সাপ্তাহিক লেনদেনের শেষদিনের সঙ্গে মিলে যায়।

অনেকে এই ‘টাইমিং’ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। কারণ, যুদ্ধের পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে তা নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যের সঙ্গে তেলের দাম ওঠানামা করছে।

শেয়ারবাজার ও তেলের দামের ওপর যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা ট্রাম্পের জন্যই নয়, ইরানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এই যুদ্ধ মার্কিন এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করছে তা দীর্ঘমেয়াদে পর্যবেক্ষণ করাটাও ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তেহরানের চাওয়া- যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হোক, যাতে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে হামলা করার আগে দশবার ভাবে।

সুতরাং, বাজার শান্ত করার জন্য আলোচনার কথা বাড়িয়ে বলা যেমন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ তেমনি বাজারকে অস্থির রাখতে এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে স্বস্তি না দিতে আলোচনার কথা অস্বীকার করাটাও ইরানের কৌশলের অংশ।

ইরানের শীর্ষ যেসব নেতার সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। কিন্তু তিনিও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার কথা অস্বীকার করেছেন। বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে আর্থিক ও তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যে চোরাবালিতে আটকে গেছে তা থেকে বাঁচতে এখন ‘ফেক নিউজ’ ব্যবহার করছে।

এদিকে ট্রাম্পের আলোচনার বার্তা দেওয়ার পেছনে ‘যথেষ্ট সময় অর্জন’ করাটাও অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে। কারণ, ওয়াশিংটন ইরানের ভূখণ্ডে কোনো ধরনের স্থল অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলে, সেক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে আরও মার্কিন সেনা পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট সময় প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের লাভ
যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে উভয়পক্ষের নিজস্ব বয়ান আছে। এ নিয়ে তারা প্রকাশ্যে মন্তব্যও করছে। কিন্তু সেগুলো থেকে আলোচনা আদৌ হচ্ছে কি না সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না। তবে কোনো বিষয়ে শীর্ষ নেতাদের মন্তব্যগুলো বিশ্লেষণ করলে একটি না একটি দিক অবশ্যই পাওয়া যায়।

যেমন- গত সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোকে তাদের (ইরান) লক্ষ্যবস্তু বানানোটা কেউ আশা করেনি। বড় বড় বিশেষজ্ঞরাও এটি বিশ্বাস করেননি।

ট্রাম্পের এমন মন্তব্য ইঙ্গিত দেয়, তিনি আসলে ইরানের সক্ষমতার অবমূল্যায়ন করেছিলেন। যা এখন উপলব্ধি করতে পারছেন। তাই এখন তাঁর পক্ষে যুদ্ধের অবসান সংক্রান্ত চুক্তি করতে চাওয়া অবাস্তব কিছু নয়।

তেলের বাজার শান্ত রাখতে ট্রাম্প ইতোমধ্যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। ইরানের কিছু তেলের ওপর থেকে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন। ২০১৯ সালের পর এই প্রথম কোনো ইরানি তেলের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলো। ইরান এখন নিশ্চয় বুঝতে পারছে, তাদের যুদ্ধ বিস্তৃত করার কৌশল কাজে দিয়েছে।

যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এমনিতেও অজনপ্রিয় ছিল। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর তা আরও প্রকট হয়েছে। কারণ, মার্কিন ভোক্তারা ইতোমধ্যে পেট্রলের দাম ও অর্থনীতির অন্যান্য ক্ষেত্রে যুদ্ধের প্রভাব টের পাচ্ছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোক্তা পর্যায়ে তৈরি হওয়া এই অসন্তোষ ট্রাম্প ও তাঁর রাজনৈতিক দলের জন্য যথেষ্ট মাথাব্যথার কারণ।

তাই ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি পথ খোলা- যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য দেওয়া অথবা দ্রুত অবসান ঘটানো।

ইরানের সম্ভাব্য দৃষ্টিভঙ্গি
ট্রাম্প যা-ই করতে চান না কেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এককভাবে তাঁর হাতে নেই। এক বছরের কম সময়ের মধ্যে ইরান দুই দফায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। তেহরান এখন ভবিষ্যতে এ ধরনের আরেকটি হামলা ঠেকানোর মতো কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেটি অর্জন না হওয়া পর্যন্ত তারা যুদ্ধ শেষ করার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখাবে না।

তাত্ত্বিকভাবে দেখলে, বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় ইরানের জন্য সংঘাত দীর্ঘ করাটা সুবিধাজনক হতে পারে। কারণ, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের শাসকরা হয়তো ধারণা করছেন, ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় যুদ্ধ বন্ধ করলে প্রতিপক্ষ ফের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম মজুতের সুযোগ পাবে।

তবে ইরানকেও একটা না একটা সময় যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রায় এক মাসের যুদ্ধে তারাও ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। অন্তত দেড় হাজার মানুষ নিহত ও বহু অবকাঠামো ধসে গেছে। আগামীতে বিদ্যুতের গ্রিড লক্ষ্য করে হামলার হুমকি আছে। উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছে। যুদ্ধ শেষে এই সম্পর্ক আগের অবস্থায় ফেরার সম্ভাবনাটাও ক্ষীণ।

ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকাটা স্বাভাবিক। তাই ইরানের তুলনামূলক মধ্যপন্থী নেতারা যুক্তি দিতে পারেন- প্রতিরোধ সক্ষমতার যথেষ্ট প্রদর্শন হয়েছে, আলোচনার জন্য এটাই উপযুক্ত সময়। এ ছাড়া, ভবিষ্যতে হামলা না করার প্রতিশ্রুতি বা হরমুজ প্রণালিতে বৃহত্তর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে ইরান ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তিতে গেলেও যেতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here