২০২৪ সাল শেষে মোট ঋণের প্রায় ২০ শতাংশ খেলাপি ছিল। এক বছরের ব্যবধানে যা ৩১ শতাংশে ঠেকেছে। খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেড়েছে কৃষি এবং ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে। অন্যদিকে ভোক্তা ঋণের বিপরীতে খেলাপির হার কমে ৩ শতাংশে নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ভিত্তিক খাতভিত্তিক ঋণের পরিসংখ্যান থেকে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলক বেশি বাড়ার কারণ হিসেবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ভোগ্যপণ্য আমদানিকারকসহ অনেক ব্যবসায়ীর পলাতক থাকা অন্যতম কারণ মনে করেন। ঋণের সুদহার ও ডলারের দর বাজারভিত্তিক করার প্রভাবও থাকতে পারে। অন্যদিকে প্রকৃত চিত্র দেখানোর ওপর জোর দেওয়ায় সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এখন আবার যুদ্ধের কারণে খুব সহসা পরিস্থিতির উন্নতি হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মতো ২০২৫ সালে এসেও মোট ঋণের মাত্র ৪ দশমিক ৪০ শতাংশ রয়েছে কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে। এই ঋণের মধ্যে গত বছর শেষে ২৮ দশমিক ২০ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এক বছর আগে যেখানে এ খাতে খেলাপির হার ছিল ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ। এর মানে খেলাপি বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। অন্য আর কোনো খাতে এত বেশি হারে খেলাপি বাড়েনি। এক বছরে খেলাপির ঋণের হার কমেছে কেবল ভোক্তা ঋণে। ২০২৪ সালে মোট ঋণের ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ ছিল ভোক্তা ঋণ। এর মধ্যে খেলাপি ছিল ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে ভোক্তা খাতে ঋণ কমে সাড়ে ৮ শতাংশে নেমেছে। এর মধ্যে খেলাপির হার আরও কমে নেমেছে ৩ শতাংশে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানার একটি ব্যাংকের একজন শাখা ব্যবস্থাপক সমকালকে বলেন, কৃষিতে খেলাপি বাড়ার প্রধান কারণ সুদহার অনেক বেড়ে যাওয়া। ২০২৪ সালে কৃষিঋণ বিতরণের সময় সর্বোচ্চ সুদহার ছিল ৮ শতাংশ। আইএমএফের শর্তের আলোকে ২০২৪ সালের মে মাসে সব ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক করা হয়। এরপর একটু করে বেড়ে আদায়ের সময় এসে তা ১২ থেকে ১৩ শতাংশ হয়েছে। যে কারণে কৃষিঋণ আদায় করতে গিয়ে অনেক বেগ পেতে হচ্ছে। আবার সেচসহ ফসল চাষের সব ধরনের খরচ বাড়লেও মধ্যস্বত্বভোগী, দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থাসহ নানা কারণে মাঠ পর্যায়ের কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের দাম সেভাবে পান না। এতে কৃষকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমেছে। এসব কারণে কৃষিঋণের খেলাপির হার এভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খাতভিত্তিক খেলাপি ঋণের হার বাড়াতে পরের অবস্থানে রয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য খাত। ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৩ দশমিক ৪০ শতাংশ রয়েছে এ খাতে। এর মধ্যে ২০২৪ সাল শেষে ২৩ দশমিক ৪০ শতাংশ ছিল খেলাপি। মোট ঋণে এ খাতের অংশ সামান্য বেড়ে গত বছর শেষে ৩৩ দশমিক ৫০ শতাংশ হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ দশমিক ৫০ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
ব্যাংক খাতের মোট ঋণের মধ্যে শিল্প খাতে সর্বোচ্চ ঋণ রয়েছে। ২০২৪ সালে এ খাতে মোট ঋণের ৪২ দশমিক ৪০ শতাংশ থেকে এক বছরে সামান্য বেড়ে গত বছর শেষে ৪৩ শতাংশে উঠেছে। তবে শিল্প খাতের খেলাপি ঋণ ২২ দশমিক ৮০ শতাংশ থেকে ৩০ দশমিক ৮০ শতাংশ হয়েছে। নির্মাণ খাতের খেলাপি ঋণের হার ১৮ দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে ২৬ দশমিক ৭০ শতাংশ হয়েছে। পরিবহন খাতে ১৯ দশমিক ৯০ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৩ দশমিক ২০ শতাংশ। অন্যান্য খাতে ৫ দশমিক ৯০ শতাংশ থেকে উঠেছে ৯ দশমিক ২০ শতাংশে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগ্যপণ্যের অনেক উঠানামা হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অনেকে বেশি দামে পণ্য এনে সেরকম দরে হয়তো বিক্রি করতে পারেনি। এর বাইরে মোট ঋণে শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের অংশ অনেক বেশি। সব মিলিয়ে এসব খাতে হয়তো খেলাপি ঋণ বেশি বেড়েছে। তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে এখন আবার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, আগামীতে কী হবে এখনই বলা যাচ্ছে না।




