অন্যান্য পেশার মতোই কৃষিতেও নারী-পুরুষ মজুরি বৈষম্য বেশ প্রকট। কৃষি কাজে একজন নারী শ্রমিকের মজুরি পুরুষ শ্রমিকের চেয়ে অন্তত ২৬ শতাংশ কম। এই প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের এ-সংক্রান্ত সর্বশেষ এক জরিপ বলছে, গত ডিসেম্বর মাসে যেখানে একজন পুরুষ কৃষি শ্রমিক দৈনিক ৬২৫ টাকা মজুরি পেয়েছেন, সেখানে একজন নারী কৃষি শ্রমিক মজুরি পেয়েছেন মাত্র ৪৬২ টাকা। কৃষি শ্রমে নিয়োজিত ১৫ বছর ও তার বেশি বয়সী শ্রমিকের মজুরির মাঠচিত্র জানতে এ-সংক্রান্ত জরিপ করে থাকে বিবিএস। ‘শস্য পরিসংখ্যান ও কৃষি শ্রম মজুরি’ নামের এই জরিপ প্রতিবেদনটি গতকাল রোববার বিবিএসের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
জানতে চাইলে শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিআইএলএসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, মজুরির এই বৈষম্য মৌলিক মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কৃষিসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক সব খাতেই এরকম মজুরি বৈষম্য রয়েছে। কৃষি কাজে একে তো মজুরি কম, তার ওপর আবার বৈষম্য।
বরেন্দ্র অঞ্চলে ঘোষণা দিয়ে পুরুষ শ্রমিকের অর্ধেক মজুরি দেওয়া হয় নারী শ্রমিককে। নারীর এই মজুরি বৈষম্যের কারণে সে পারিবারিকভাবে নিগৃহীত হয়। পুরষের ক্ষেত্রে একাধিক বিয়ের এটা অন্যতম বড় কারণ। তিনি বলেন, শ্রম সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক অপ্রাতিষ্ঠানিক কিংবা সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে একটা জাতীয় মজুরি কাঠামো গঠনের সুপারিশ করেছেন তারা। যাতে একজন শ্রমিক তার মজুরি দিয়ে পরিবার নিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে। এতে মজুরি বৈষম্য কমবে। এ ছাড়া শ্রমিকের একটা তথ্য ব্যাংক ও পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা এবং অন্তত জেলা পর্যায়ে শ্রম-সংক্রান্ত অভিযোগে প্রতিকার দেওয়ার জন্য সরকারি নির্দিষ্ট দপ্তর প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেছেন তারা, যাতে শ্রমিক তার যে কোনো বঞ্চনা জানিয়ে সহজেই প্রতিকার পেতে পারেন। এর আগে জারি করা শ্রম আইন সংশোধন অধ্যাদেশটি এখন জাতীয় সংসদে রয়েছে– এটি আইন আকারে পাস হলে মজুরি বৈষম্য কমতে পারে।
বিবিএস মাসিক ভিত্তিতে কৃষি মজুরির হারের পরিসংখ্যান প্রস্তুত করে। কৃষি মজুরির হার সংগ্রহের জন্য প্রতিটি উপজেলা থেকে নমুনা হিসেবে ১০ জন কৃষি দিনমজুরের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে উপজেলার কৃষি শ্রমের হার গণনা করা হয়। সব জেলার মজুরির হার পাওয়ার পর তার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সামগ্রিক কৃষি মজুরির হার গণনা করা হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের সর্বশেষ ২০২৪ সালে প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ৪৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ কৃষি কাজে নিয়োজিত। দেশের মোট শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণকারী নারীর সংখ্যা দুই কোটি ৩৭ লাখ। এর মধ্যে কর্মে নিয়োজিত আছে দুই কোটি ২৮ লাখ ৭০ হাজার। ক্যাম্পেইন ফর সাসটেইনেবল লাইভলিহুডস-সিএসআরএলের উপাত্ত বলছে, বাংলাদেশে কৃষি খাতের ২১ ধরনের কাজের মধ্যে ১৭ ধরনের কাজেই গ্রামীণ নারীরা অংশগ্রহণ করে। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, নারীরা পুরুষের তুলনায় তিন গুণ বেশি কাজ করে। তারপরও নারীদের শ্রম মূলত গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে পরিবারের আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।
জরিপ বলছে, গত ডিসেম্বর মাসে তিন বেলা খোরাকির সঙ্গে একজন পুরুষ শ্রমিক মজুরি পেয়েছেন ৫২৩ টাকা, যা নারী শ্রমিকের জন্য ছিল ৩৮৫ টাকা। অন্যান্য মাসেও প্রায় অভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। অর্থাৎ, এখনও মজুরির সঙ্গে তিন বেলা খোরাকি দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে কৃষি কাজে। এক বেলা ও দুই বেলার রেওয়াজ আছে কোথাও কোথাও। তবে জরিপে এ ধরনের এলাকাভিত্তিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়নি। অবশ্য, জরিপ বলছে, খোরাকি এক বেলা হোক অথবা তিন বেলা যাই হোক না কেন, মজুরি বৈষম্য সব ক্ষেত্রেই খাড়া।
জরিপে খোরাকিসহ মজুরি এবং খোরাকি ছাড়া মজুরির চিত্র আলাদা দেখানো হয়েছে। এতে দেখা যায়, খোরাকিবিহীন একজন কৃষি শ্রমিক গত ডিসেম্বর মাসে দৈনিক মজুরি পেয়েছেন গড়ে ৬২৫ টাকা, যা একজন নারী শ্রমিক পেয়েছেন ৪৬২ টাকা।




