জ্বালানি সংকট সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়াচ্ছে, উন্মোচিত করছে নীতিগত সীমাবদ্ধতা: দেবপ্রিয়

0
4

চলমান জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতা আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং নীতিগত কাঠামোর সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন নাগরিক প্ল্যাটফর্ম-এর আহ্বায়ক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। এতে রাজস্ব স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক ভারসাম্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ওপর ঝুঁকি বাড়ছে বলে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন।

আজ মঙ্গলবার ঢাকার ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘নতুন সরকারের প্রথম বাজেট নিয়ে ভাবনা’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এ কথা বলেন। সিটিজেনস প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজিস, বাংলাদেশ আয়োজিত ওই আলোচনায় তিনি বলেন, জ্বালানি ধাক্কা এমন এক নীতিগত পরিবেশে ঘটছে, যেখানে সরকারের কার্যকর প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা সীমিত।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তির কিছু বিধান বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি কৌশলকে ক্রমশ সীমিত করে ফেলছে। “নিষেধাজ্ঞা সমন্বয় এবং ‘নন-মার্কেট কান্ট্রি’ সংক্রান্ত ধারাগুলোর কারণে তুলনামূলক সস্তা উৎস যেমন রাশিয়ার তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক ছাড় নিতে হচ্ছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি দামের অস্থিরতার সময় আমাদের ক্রয়-সুবিধা কমে গেছে।”

ত্রিমুখী ম্যাক্রো প্রভাব
সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এ সংকট রাজস্ব, বৈদেশিক ও মুদ্রানীতি—এই তিনটি ক্ষেত্রে একযোগে প্রভাব ফেলছে। বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কর্মসূচির সংস্কার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণের আইএমএফ শর্ত পূরণ এবং বড় আকারের ভর্তুকি বজায় রাখা—এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বৈদেশিক খাতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে বছরে প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় হতে পারে, যা জিডিপির প্রায় ১.১ শতাংশের সমান। এতে চলতি হিসাবের ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা টাকার ওপর অবমূল্যায়নের চাপ সৃষ্টি করছে। পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে উপসাগরীয় অঞ্চলের সম্ভাব্য অস্থিরতা। কারণ, মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেকই ওই অঞ্চল থেকে আসে, যা বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যের একটি প্রধান ভরসা।

কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্ত
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এই সংকট মোকাবিলায় সরকারকে কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। রাজস্ব সুরক্ষায় বিদ্যমান জ্বালানি কর কাঠামো বজায় রাখা হবে, নাকি ভোক্তাদের চাপ কমাতে তা কমানো হবে—এই দ্বিধায় সরকারকে পড়তে হচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) প্রায় ৫৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার আর্থিক ঘাটতি সামাল দিতে জেট ফুয়েলের মতো কিছু ক্ষেত্রে মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক দামের পুরো প্রভাব দেশীয় বাজারে প্রয়োগ করলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিনিয়োগে ধীরগতি
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ কমে জিডিপির প্রায় ২২.৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। জ্বালানি খাতে অনিশ্চয়তা ও ব্যয় বৃদ্ধি বেসরকারি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে, যা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এমন নীতিগত পদক্ষেপ নিতে হবে, যা রাজস্ব শৃঙ্খলা, বৈদেশিক স্থিতিশীলতা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবে। সতর্কভাবে পরিস্থিতি সামাল না দিতে পারলে জ্বালানি সংকট আরও বড় ধরনের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নিতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here