আরিফিন শুভ– নামটির সঙ্গে যেন জড়িয়ে আছে এক অপূর্ণ সম্ভাবনার গল্প। সুঠাম দেহ, নায়কোচিত উপস্থিতি, ক্যামেরার সামনে স্বচ্ছন্দ অভিনয়– বড় পর্দার নায়ক হওয়ার জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সবই রয়েছে তাঁর মধ্যে। তবুও দর্শকদের মনে এক ধরনের আক্ষেপ থেকেই যায়। যেন ঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়নি এই শক্তিশালী সম্ভাবনাকে।
ঢালিউড বারবারই এমন একজন নায়ককে পুরোপুরি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে– এমন অভিযোগ নতুন নয়। অথচ কল্পনা করা যায়, যদি এই মাপের একজন অভিনেতা বলিউডের মতো ইন্ডাস্ট্রির হাতে পড়তেন, তবে তাঁকে ঘিরে কত বৈচিত্র্যময়, শক্তিশালী আর আন্তর্জাতিক মানের সিনেমা তৈরি হতে পারত! যার উজ্জ্বল উদাহরণ শুভর সদ্য মুক্তি পাওয়া বলিউড সিরিজ ‘জ্যাজ সিটি’। সিরিজটির মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করছেন ঢাকাই সিনেমার এই শুভ। তাই বলা যায়, ২৫৭ টাকা নিয়ে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় আসা আরিফিন শুভ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এখন আন্তর্জাতিক পরিসরে। নিজের প্রথম বলিউড সিরিজ ‘জ্যাজ সিটি’ ১৯ মার্চ মুক্তির পর ভারতীয় শীর্ষ গণমাধ্যমগুলোর পর্যালোচনায় বারবার উঠে আসছে তাঁর নাম। কখনও ‘স্ট্যান্ডআউট লিড’, কখনও বা সিরিজের সবচেয়ে ‘শক্তিশালী চরিত্র’ হিসেবে আরিফিন শুভকে মূল্যায়ন করছে।
ময়মনসিংহ টু মুম্বাই
অনেকটা খালি হাতে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় এসেছিলেন আরিফিন শুভ। পুঁজি হিসেবে ছিল উচ্চাশা, পরিশ্রম আর কিছু করে দেখানোর চেষ্টা। এই তিন পুঁজি তাঁকে বিফল করেনি। দুই হাত ভরে দিয়েছে সফলতা। আরিফিন শুভ বলছিলেন, আমার মনে হয় এই তো সেদিনই ময়মনসিংহ থেকে খালি হাতে ঢাকায় এসেছিলাম। পরিশ্রম করে গেছি দীর্ঘদিন, সেটা এখনও চলমান রেখেছি। এই শহর আমার পরিশ্রম ভালোবাসা হিসেবে ফেরত দিয়েছে। এরপর ভিন্ন দেশে (মুম্বাই) কাজের সুযোগ এসেছে, সেখানেও পরিশ্রম করে যাচ্ছি। প্রথম কাজে সেখানকার দর্শকদের ভালোবাসাও পাচ্ছি। আরও বড় স্বপ্ন দেখতে চাই এখন।’

ভারতীয় ইন্ডাস্ট্রিতে আগেও কাজ করেছেন আরিফিন শুভ। সেখানকার ওটিটি জি-ফাইভে দেখা গেছে তাঁর কাজ। এরপর মুজিব সিনেমায় শ্যাম বেনেগালের নির্দেশনায় কাজের সূত্র ধরে বলিউডের নামি-দামি সব নির্মাতা ও হাউসের সঙ্গে সম্পর্ক হয়। তবে সেটা কেবল সম্পর্কই। মাহেন্দ্রক্ষণটা আসে আরও পরে। সময়ের আলোচিত ‘ধুরন্ধর’ সিনেমার কাস্টিং ডিরেক্টর মুকেশ ছাবড়া ‘জ্যাজ সিটি’র জন্য হঠাৎ করেই যোগাযোগ করেছিলেন শুভর সঙ্গে। নায়কের ভাষ্যে এমন, ‘এই কাজের জন্য পরিচালক সৌমিকদা (সৌমিক সেন) নন, আমাকে প্রথম মেসেজ করেন কাস্টিং ডিরেক্টর মুকেশ ছাবড়া। আমি তখন নেপালে। আমাকে বলেন, অডিশন দিতে হবে একটি ওয়েব সিরিজের জন্য। আমি এককথাতেই রাজি হয়ে যাই।’
তবে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই যে, এই এক অডিশনেই জ্যাজ সিটিতে সুযোগ মিলেছে শুভর। বলতে গেলে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শুরু কেবল। শুভ বলেন, ‘এভাবে যুদ্ধের শুরুটা হয়েছে। বিদেশি যে কোনো প্রজেক্ট লম্বা প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত করা হয়। তেমনটাই হয়েছে; হিন্দি, ইংরেজি, উর্দু ও বাংলা চার ভাষায় অভিনয়ের জন্য আমাকে একাধিকবার অডিশনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এমনটা না যে আমার একার অডিশন হয়েছে, ভারতের একাধিক অভিনেতা এই চরিত্রের জন্য অডিশন দিয়েছেন। পরিচালক সৌমিক সেন লম্বা প্রক্রিয়া শেষে আমাকে চূড়ান্ত করেছেন।’
সিরিজটির পরিচালক সৌমিক সেন আরিফিন শুভর ব্যাপারে বলেছেন, ‘আমি অনেকের অডিশন নিয়েছি, তারা সবাই খুব ভালো অভিনেতা। কিন্তু জিমি রায় চরিত্রের জন্য আমার কাছে (আরিফিন শুভ ছাড়া) দ্বিতীয় কোনো বিকল্প ছিল না।’

শুভ বরাবরই দীর্ঘ সময় নিয়ে কাজ করেন। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি প্রজেক্টে কাজ করার ইতিহাস দেখলে সেটা প্রতীয়মান। তাই কোনো ভালো প্রজেক্টের পেছনে শুভকে সময় দিতে বললে সেটা লুফে নেন তিনি। জ্যাজ সিটির সঙ্গেও ঘটেছে তেমনটি। শুভ এই প্রজেক্টটির জন্য প্রায় তিন বছর সময় দিয়েছেন। শুভ বলেন, ‘প্রায় ৩ বছর সিরিজের জন্য সময় দিয়েছি। শুটের সময় ভারতে ছিলাম প্রায় ৭ মাস। মুক্তির পর হলিউড রিপোর্টারসহ ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতে আমার কাজের প্রশংসা দেখে সেটা আমাকে উৎসাহ দিচ্ছে আরও পরিশ্রমী হওয়ার। ভারতসহ অনেক দেশ থেকে ফোন কলও পাচ্ছি। সূচনা ভালো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।’
জ্যাজ সিটি মোট ১০ পর্বের সিরিজ। প্রায় ৮ ঘণ্টার এই সিরিজে আরিফিন শুভর চরিত্রের নাম জিমি রায়। তাঁকে ঘিরেই এই সিরিজের গল্প। সে কাল্পনিক ক্লাব ‘জ্যা জ সিটি’র কর্ণধার। যে নিজের রিফিউজি পরিচয় মুছে এই এলিট ক্লাবের সর্বেসর্বা হয়ে উঠেন। এই ক্লাব গুপ্তচরবৃত্তির আখড়া। হিন্দি, ইংরেজি, উর্দু ও বাংলা চার ভাষায় সংলাপ বলেছেন শুভ।
সিরিজটি মুক্তির পর আরিফিন শুভর অভিনয়ের দারুণ প্রশংসা করছে ভারতীয় শীর্ষ গণমাধ্যমগুলো। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শীর্ষ বিনোদন ম্যাগাজিন হলিউড রিপোর্টার তাদের ইন্ডিয়ান সংস্করণে ‘জ্যাজ সিটি’ সিরিজের পর্যালোচনায় লিখেছে, এই সিরিজে সবচেয়ে কার্যকর দিক হলো বাংলাদেশি তারকা আরিফিন শুভর প্রধান চরিত্রে অভিনয়। তাদের ভাষায়, তাঁর পারফরম্যান্সই দর্শককে ধরে রাখার অন্যতম প্রধান কারণ। এ ছাড়া টাইমস অব ইন্ডিয়া, স্ক্রল, মানিকন্ট্রোল, এম৯ নিউজ, নিউজবাইটস, হিন্দি সংবাদপত্র অমর উজালাসহ অনেকেই প্রশংসায় ভাসিয়েছেন শুভকে। শুভকে ‘স্ট্যান্ডআউট লিড’, কখনও বা সিরিজের সবচেয়ে ‘শক্তিশালী চরিত্র’ বলছে গণমাধ্যমগুলো।

হলিউডের প্রজেক্ট অপেক্ষায়
বলিউডে তো কাজ করা হচ্ছে। শুভর এবারের টার্গেট হতে পারে হলিউড। কয়েক বছর আগে এমন গুঞ্জন উঠেছিল। সে গুঞ্জন পানি পায় সাম্প্রতিক সময়ে তাঁকে প্রায়ই যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া আসা দেখে। তাই অনেকটা আন্দাজে ডিল ছোড়ার মতো প্রশ্ন করা হয় এরপর কি হলিউডে কাজ করছেন? এমন প্রশ্নে নীরব আরিফিন শুভ। উত্তর দিলেন অল্পকথায়, ‘আমি বড় স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষায় অভিনয় করতে চাই। আল্লাহ যেন সেই সুযোগ দেন সেই দোয়া চাই আপাতত।’ শুভর এই উত্তরে বড় কিছুর ইঙ্গিত বিদ্যমান। তবে যদি এটা হয় তাহলে বিশাল কিছু ঘটে যাবে। বাংলাদেশের নায়কের হলিউড বিজয়ের ইতিহাসও রচিত হবে নতুন করে।
মালিক ও অন্যান্য কাজ
উপরে তো গেল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুভর কাজের বিস্তৃতির খবর। দেশেও সমান ব্যস্ততা বাড়ছে তাঁর। নায়কের শিডিউলের খাতার দিকে তাকালে দেখা যায়, আসন্ন ঈদুল আজহায় মুক্তির অপেক্ষায় আছে আরিফিন শুভর সিনেমা ‘মালিক’। সেই লক্ষ্যে প্রস্তুতি শেষ হচ্ছে চলতি মাসেই। কাজ শেষ করা অনম বিশ্বাসের ‘ঠিকানা বাংলাদেশ’ সিনেমাও মুক্তি পাচ্ছে চলতি বছরের মাঝামাঝিতে। এ ছাড়া ‘লহু’ শিরোনামে কলকাতার ওয়েব সিরিজও মুক্তি পাবে এই বছরে। নতুন কাজের ব্যাপারে বরাবরই চুপচাপ আরিফন শুভ। তবুও জানতে চাওয়া। শুভর সেই কৌশলী উত্তর, ‘দেশে কাজের ব্যাপারে কথা চলছে। আর দেশের বাইরেও একাধিক প্রজেক্ট নিয়ে কথা বলছে। আমি আসলে কাজ করেই কথা বলতে পছন্দ করি।’




