দুপুর ১২টা ২২ মিনিট। হঠাৎ ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি। চট্টগ্রাম নগরীর নিউমার্কেটের পরিত্যক্ত ফুট ওভারব্রিজের নিচে ফুটপাতে নতুন কাপড় বৃষ্টি থেকে রক্ষায় ব্যস্ত বৃদ্ধ হকার আবদুর রশিদ। আকস্মিক এই বৃষ্টির মতোই এক বছরে তাড়া করে তাঁর দোকান সিটি করপোরেশন চারবার উচ্ছেদ করেছে। আবারও বসেছেন। ২৪ মাসে সাতবার চলেছে উচ্ছেদ উচ্ছেদ খেলা। কেমন চলছে ব্যবসা– এ প্রশ্ন করতেই বলেন, ‘এ ফুটপাতে ১৮ বছর ধরে ব্যবসা করছি। এর আগে এখানে ব্যবসা করতেন নাজমুল আলম নামে আরেকজন হকার। তাঁর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকায় জায়গাটি (ফুটপাত) কিনে নিয়েছি।’
একটু সামনে যেতেই দেখা যায় কুমিল্লার মুরাদনগরের হকার আবু ছিদ্দিক প্লাস্টিকের পলি দিয়ে শার্টের দোকান (চৌকি) ঢাকছেন। আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ‘ছয় বছর ধরে বিদেশি শার্টের ব্যবসা করছি। আগে আমার চাচা করতেন এ ব্যবসা। এখানে ব্যবসা করতে প্রতিদিন হকার্স সমিতিকে ২০ টাকা করে চাঁদা দিই। প্রায় চার হাজার হকার প্রতিদিন ২০ টাকা করে বছরে তিন কোটি টাকা চাঁদা দেন। অন্য কাউকে চাঁদা দিতে হয় না।’
কথা শেষ হলে মূল সড়ক পার হয়ে বিপরীতে তামাকমুণ্ডি লেইনের মুখের ফুটপাতে গিয়ে দেখা যায় জিন্স প্যান্টের দোকান খুলে ব্যবসা করছেন নোয়াখালী থেকে আসা রজব আলী। তিনি বলেন, ‘এ এলাকায় যত হকার আছে সবাই এক নিয়মে ব্যবসা করেন। সমিতি যেভাবে বলে আমরা সেইভাবে চলি। সমিতিতে প্রতিদিন ২০ টাকা চাঁদা দিই। তবে সন্ধ্যার পর প্রতিটি বাতি (লাইট) জ্বালানোর জন্য পাশের দোকানদারকে ৩০ টাকা করে দিতে হয়। মার্কেটের যে দোকান থেকে বিদ্যুতের লাইন নিয়েছি, তারা টাকা নেন। চার হাজার হকার এভাবেই টাকা দিয়ে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করেন।’
গত মঙ্গলবার দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, নিউমার্কেটের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত তিন থেকে চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসেছে হকার। ফুটপাত ও সড়কের একাংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। নিউমার্কেট থেকে আমতল, আমতল থেকে শহীদ মিনার হয়ে সিনেমা প্যালেস, আমতল থেকে জুবলী রোড, নিউমার্কেট থেকে পুরাতন রেলস্টেশন, নিউমার্কেট থেকে কোতোয়ালি মোড়, নিউমার্কেট থেকে সিটি কলেজ হয়ে সদরঘাট মেমন মাতৃসদন হাসপাতাল পর্যন্ত ফুটপাতসহ সড়কের অংশ এখন হকারদের নিয়ন্ত্রণে। এতে দুর্ভোগে পড়েন পথচারী।
চট্টগ্রামের মেয়র হিসেবে ডা. শাহাদাত হোসেন দায়িত্ব নিয়েই চারবার অভিযান চালিয়েছেন। এর আগে মেয়র রেজাউল করিমের আমলে হয়েছে তিনবার। এভাবে ২৪ মাসে সাতবার উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে। তবু বাড়ছে দোকান। সকালে উচ্ছেদ করার পর বিকেলেই ফের দখল। যতবার উচ্ছেদ হয়েছে ততবার বেড়েছে চাঁদার হার।
গত মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর আমতল থেকে শহীদ মিনার হয়ে সিনেমা প্যালেস সড়কের থিয়েটার ইনস্টিটিউট লাগোয়া ফুটপাতে গিয়ে দেখা যায় ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির কিছু দোকান। ডাবের দোকান, চা-বিস্কুটের টং দোকান ফুটপাতের ওপর। আরেকটু এগোতেই শহীদ মিনার লাগোয়া গ্রন্থাগারের সামনে গিয়ে দেখা যায় বিশাল ফুটপাতে ২০ থেকে ২৫টি দোকানে দেশীয় চেয়ার, টেবিল ও খাটের পসরা সাজানো। ফুটপাতে থাকা দোকানে মিস্ত্রিদের করাত নিয়ে কাজ করতেও দেখা যায়। পথচারীরা হাঁটছেন সড়কের ওপর দিয়ে।
একইভাবে নিউমার্কেট মোড় থেকে সিটি কলেজ হয়ে রেলওয়ের সীমানা দেয়াল ঘেঁষে ফুটপাতে সারিবদ্ধভাবে ফলের দোকান, সাইকেলের গ্যারেজ, ভাতের টং দোকান খুলে বসেছেন হকাররা। এ ছাড়া সিটি কলেজ মোড় থেকে সদরঘাট রোডের মেমন মাতৃসদন হাসপাতালের উভয় পাশে সবজি, মাছ, ফলের ভ্যানগুলো চলাচলের জায়গা দখল করে আছে। মাংসের দোকানও আছে ফুটপাতে।
নগরের কোতোয়ালি থানার ওসি আফতার উদ্দিন বলেন, নিউমার্কেট এলাকায় হকার বসছে বহুদিন ধরে। সাধারণ মানুষ যাতে ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে পারে তা নিশ্চিত করেই দোকান বসিয়ে ব্যবসা করছে। সিটি করপোরেশন হকার উচ্ছেদের বিষয়টি দেখে।
নিউমার্কেট ঘিরে চার হাজারের বেশি তালিকাভুক্ত হকার আছে। হকাররা তিনটি বড় শ্রমিক সংগঠনের সদস্য। বিনা বাধায় সড়ক ও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করতে এ তিনটি সংগঠন সাধারণ হকারদের মাথার ওপর ছায়া হয়ে কাজ করে। প্রতিদিন চার হাজার হকার থেকে সংগঠনগুলো ২০ টাকা করে ৮০ হাজার টাকা চাঁদা তুলছে। বছরে হয় প্রায় তিন কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে হকারদের ওপর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী চক্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল। এখন হকার সমিতির নিয়ন্ত্রণ শ্রমিক দল নেতাদের কবজায়। চট্টগ্রাম সম্মিলিত হকার্স ফেডারেশনের সভাপতি মিরন হোসেন মিলন। সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. জসিমসহ বিএনপিপন্থিদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হকারদের ওপর।
মিরন হোসেন মিলন বলেন, নিউমার্কেট এলাকায় পাকিস্তান আমল থেকে ফুটপাতে হকাররা ব্যবসা করে আসছেন। সদস্যদের থেকে যে টাকা নেওয়া হয় তা দিয়ে অফিস, বিদ্যুৎ খরচ, কোনো হকার মারা গেলে তাঁর কফিন বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া, সন্তানদের বিয়েতে অনুদানসহ নানা কাজে ব্যয় করা হয়।




