বিতর্কের মধ্যে শুরু হচ্ছে অনলাইন ও অফলাইন ক্লাস

0
5

জ্বালানি সংকটের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ও সশরীরে– এই দুই পদ্ধতির সমন্বয়ে ক্লাস চালুর সরকারি সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্ক। অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের বড় অংশ এ উদ্যোগকে অবাস্তব, বৈষম্যমূলক এবং শিক্ষার জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করছেন।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস হবে। এর মধ্যে শনি, সোম ও বুধবার সশরীরে এবং রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার অনলাইনে পাঠদান করা হবে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, প্রাথমিকভাবে রাজধানীর কিছু নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানে এই পদ্ধতি চালু করা হবে।

তবে এই ঘোষণার পর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। অনেকেই বলছেন, সন্তানের জন্য আলাদা ডিভাইস ও নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো বেশি বিপাকে পড়েছে। অনেকে সকালে সন্তানকে স্কুলে দিয়ে কর্মস্থলে যান, আবার ক্লাস শেষে নিয়ে আসেন। কিন্তু অনলাইন ক্লাস চালু হলে শিশুদের বাসায় রেখে মোবাইল বা ল্যাপটপ দিয়ে রেখে যেতে হবে। এটি নিরাপত্তা ও মানসিক বিকাশের বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এতে শিশুদের ডিভাইস আসক্তি বাড়বে এবং পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাবে।

নজরুল ইসলাম চৌধুরীর দুই সন্তান রাজধানীর রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র। একজন ষষ্ঠ শ্রেণিতে, অন্যজন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে, এমন খবর শোনার পর থেকেই উদ্বিগ্ন তিনি।

নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘আমার ও আমার স্ত্রীর দুটি মোবাইল ফোন আছে। আমারটা নিয়ে অফিসে যাই। বাসায় স্ত্রী যে ফোনসেট ব্যবহার করেন, তা দিয়ে ইন্টারনেট চালানো যায় না। আমার ফোন বাড়িতে রেখে গেলেও দুই সন্তান একসঙ্গে অনলাইনে ক্লাস করতে পারবে না। ওদের কি জনে জনে ফোনসেট কিনতে হবে? এটা কি হুট করে বললেই সম্ভব?’

আরিফুল ইসলাম জোয়ারদার নামের এক অভিভাবক সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আর ক্ষতি করবেন না। করোনার মধ্যে অনলাইন ক্লাস, অটোপাস দিয়ে তিন-চারটা বছর পার হয়েছে। ওই সময় কিছুই শিখতে পারেনি। আমার ছেলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত করোনাকালে কিছু শেখেনি। আবার অনলাইনে ক্লাসের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার পক্ষে নই আমরা।’

গত তিন সপ্তাহ ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালু নিয়ে আলোচনা চললেও, এটা চালু হলে কতদিন চলবে, তা নিয়ে এখনও কিছুই স্পষ্ট করেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন অফলাইন বা সশরীরে ক্লাস চালুর বিষয়ে ঘোষণা দিলেও কতদিনের জন্য এই সিদ্ধান্ত তা নিয়ে কিছু বলেননি। সবশেষ ৯ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষামন্ত্রী জানান, শুধু ঢাকার নির্বাচিত কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তিন দিন অনলাইন ক্লাস চালু করা হবে। কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামও উল্লেখ করেন তিনি, যেগুলোতে প্রাথমিকভাবে অনলাইনে ক্লাস চালু করা হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ।

মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বনশ্রী শাখার পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী সাবিনা ইয়াসমিন। তার বাবা আফজাল হোসেন বলেন, ‘অনলাইন ক্লাসটা আমরা চাই না বলার পরও সরকার চাপিয়ে দিচ্ছে। আমার তিন সন্তান। এক ছেলে ও দুই মেয়ে। সবাই স্কুলপর্যায়ে পড়ালেখা করে। তিনজনের জন্য তিনটি মোবাইল দরকার। কিন্তু বাসায় আছে একটা। আমারটা তো আমাকে ব্যবসায়িক কাজে সঙ্গে রাখতে হয়। আমি বাসায় থাকি না। ওদের আম্মুও বেসরকারি চাকরিজীবী। তাহলে বাসায় ওদের জন্য পৃথক তিনটি নতুন মোবাইল এখন কে কিনে দেবে?’

রাজউক উত্তরা মডেল কলেজেও অনলাইন ক্লাস চালু করতে চায় সরকার। অথচ এ প্রতিষ্ঠানের তিনজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এটা চালুর পক্ষে নন। আফরিন নাহার নামে একজন বলেন, ‘বাসায় ওয়াইফাই নেই। মোবাইল ইন্টারনেট চালানো হয়। এখন দুই ছেলের জন্য দুটি ফোন এবং মাসে অন্তত ২০ জিবি নেট কিনতে হবে। মোবাইল ও ইন্টারনেটের এ প্যাকেজ কেনার খরচ কে দেবে?’

ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীর অভিভাবক আমেনা খাতুন। তিনি পেশায় চিকিৎসক। তাঁর স্বামী শুভ আহমেদও চিকিৎসক। তারা দুটি সরকারি হাসপাতালে চাকরি করেন। হাসপাতালে কাজ শেষে প্রাইভেট ক্লিনিকে বসেন। তারা জানান, সন্তানদের মোবাইল ফোন দেওয়া হয় না। এখন এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।

উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সাব্বির আহমেদ সরকারকে উদ্দেশ করে বলেন, শিক্ষার্থীদের আর ক্ষতি করবেন না। করোনার মধ্যে অনলাইন ক্লাস, অটোপাস দিয়ে তিন-চারটা বছর পার হয়েছে। ওই সময় কিছুই শিখতে পারেনি। আমার ছেলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত করোনাকালে কিছু শেখেনি। আবার অনলাইনে ক্লাসের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার পক্ষে নই আমি।

ডিভাইস আসক্তির আশঙ্কা
মনোবিদ, শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সব দিক রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুরা এমনিতেই মোবাইল, কম্পিউটার ও টেলিভিশন দেখে বিনোদনের চাহিদা মেটাচ্ছে। ধীরে ধীরে তারা এসব ডিভাইসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। এভাবে ডিজিটাল আসক্তি নিয়ে শিশুদের বেড়ে ওঠা অস্বাভাবিক। চোখে সমস্যা দেখা দেওয়া, স্থূল হয়ে যাওয়াসহ নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যা শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনলাইনে ক্লাস চালুতে তাদের এই আসক্তি আরও বাড়বে।

বিশিষ্ট লেখক, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নেই, কোনো খেলাধুলার ব্যবস্থা নেই। সব কিছুতেই শিশুদের ওপর একটা চাপ। লেখাপড়ার পাশাপাশি তারা যে বিনোদন পাবে, সেটা পায় না। এমন শিক্ষাজীবন শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠাকে বাধাগ্রস্ত করে। শিশুরা এখন ট্যাব, মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকে। মানুষের সঙ্গে মিশতে পারে না। অনেকভাবে আমরা এর কুফল এখনই ভোগ করছি।’

টেলিফোনে পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যম সরকারের স্বাস্থ্য বাতায়নে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসক ডা. নিশাত জাহান অরিন বলেন, ‘শিশুরা মোবাইল, ট্যাব, কম্পিউটারে আসক্ত হয়ে পড়লে তাদের মানসিক বিকাশে সমস্যা হতে পারে। শিশুর চোখ ব্রেইন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’

সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক নেহাল করিম বলেন, ‘আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শীর্ষে অবস্থান করছি, এ জন্য এর প্রভাব আমাদের মধ্যে থাকবে। আমরা ডিভাইস নিয়ে এত ব্যস্ত যে, সময় বের করতে পারছি না। শিশুরাও এর মধ্যে ঢুকে পড়েছে।’

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী অনলাইন ক্লাসের এ সিদ্ধান্তকে সরকারের ‘বাজে কাজ’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘সংকট আছে, সেটা ঠিক। কিন্তু শিক্ষাকে কেন সংকুচিত করার পথে হাঁটতে হবে। সরকারের উচিত এ থেকে সরে আসা।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার উন্নয়নে সম্প্রতি গঠিত পরামর্শক কমিটির প্রধান হিসেবে কাজ করেন অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ। তিনি বলেন, শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক দেশই আপৎকালীন পরিস্থিতিতে অনলাইন ক্লাস চালু করে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে অনলাইন ক্লাস চালুর পর সেই অভিজ্ঞতা ভালো নয়। করণীয় সম্পর্কে অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময় কিছুটা পরিবর্তন করা যেতে পারে। সকালে ক্লাস হলে আবহাওয়া ঠান্ডা থাকবে। এতে বৈদ্যুতিক পাখা, এসি কম চালানোর প্রয়োজন পড়বে। ছুটির দিন পরিবর্তন করেও ক্লাস নেওয়া যেতে পারে।

সরকারের ভাষ্য
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক সমকালকে বলেন, কারও ওপর এটা চাপিয়ে দেওয়া হবে না। তবে আমাদের আপৎকালীন সময়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। সেজন্য আমরা ঢাকা শহরের সবচেয়ে নামি কয়েকটি নির্বাচিত স্কুলে এটা চালুর চেষ্টা করছি। স্কুলগুলো তাদের সমস্যা ও সংকট জানিয়েছে। সেগুলো আমরা সমাধান করে তারপর অনলাইন ক্লাস চালু করব। কেউ এখানে বঞ্চিত বা চাপের মুখে পড়বে বলে আমরা মনে করি না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here