জ্বালানি সংকট পাম্পে দুর্ভোগ, ফুয়েল পাস অ্যাপেও বিড়ম্বনা

0
5

রাজধানীর আসাদগেট। শনিবার সকাল সাড়ে ৭টা। ওই এলাকার একটি পেট্রোল পাম্প ঘিরে ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি আর মোটরসাইকেলের জটলা। ট্রাকচালক রিয়াজুল ইসলাম স্টিয়ারিংয়ে মাথা রেখে ঝিমাচ্ছেন। গত শুক্রবার রাত ২টা থেকে লাইনে তিনি।

রিয়াজুল বললেন, আগে রাতে ঢাকার বাইরে থেকে যাত্রা করে ভোরে কারওয়ান বাজারে কাঁচামাল নিয়ে পৌঁছাতাম। আর এখন ভোর হয় তেলের লাইনে। ট্রিপ মারব কখন, আর ঘুমাব কখন? শরীরের ওপর দিয়ে যে ধকল যাচ্ছে, তাতে যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

একই এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ে তেলের জন্য অপেক্ষায় থাকা ব্যাংকার রবিউল হাসান ঘড়ি দেখছেন বারবার। সকাল ৯টায় অফিস, তাঁর সামনে এখনও অন্তত ২০টি মোটরসাইকেল। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এক মাস ধরে আমার রুটিন পাল্টে গেছে। যেদিন মোটরসাইকেলের তেল শেষের দিকে থাকে, তখন শুরু হয় দুশ্চিন্তা। কখন, কীভাবে তেল মিলবে।

তেলের জন্য লাইনে দাঁড়ালে অফিসে পৌঁছাতে পারব কিনা? কয়েকবার অফিস ছুটি নিয়ে তেল সংগ্রহ করতে হয়েছে। সারাদেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট এখন আর শুধু সংকটের গল্প নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার স্বাভাবিক শৃঙ্খলাকে বদলে দিয়েছে। কর্মঘণ্টার সিংহভাগ এখন ব্যয় হচ্ছে রাস্তায় তপ্ত রোদে ফিলিং স্টেশনের লম্বা লাইনে। মানুষের যাতায়াত, বাজার করা, এমনকি পারিবারিক সময় কাটানোর সুযোগও এখন কেড়ে নিচ্ছে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা।

স্থবির কর্মজীবন
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ইকবাল কবির জানান, শনিবার অফিসে সাপ্তাহিক বৈঠক দুপুর ১২টায়। বৈঠক ধরতে সাড়ে ১১টায় বছিলার বাসা থেকে বের হলেই হতো। আজ (শনিবার) মোটরসাইকেলের তেল নিতে সকাল ৭টায় বাসা থেকে বের হয়েছি, তার পরও সময়মতো বৈঠক উপস্থিত থাকতে পারিনি। ইকবাল বলেন, এই অনিশ্চয়তা মানসিক স্বাস্থ্য আর কাজের মনোযোগ– দুটোই শেষ করে দিচ্ছে।

গতকাল রাজধানীর মালিবাগ, তেজগাঁও, রামপুরা ও কল্যাণপুর এলাকার প্রতিটি পাম্পের চিত্র এখন একই। তেলের সংকটে রাইড শেয়ারিং অ্যাপের চালকদের জীবন-জীবিকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পল্টন এলাকায় উবার চালক লুৎফর রহমানরে কণ্ঠে ঝরল হতাশা। বললেন, ‘ভাই, অ্যাপ চালু করলে কাস্টমার ডাকে, কিন্তু গাড়িতে তেল নাই। সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে যা পাই, তা দিয়ে তেলের দাম ওঠে না। পরিবারের বাজার করব, নাকি পাম্পে এসে লাইন দেব?’

এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে দীর্ঘ লাইনের কারণে যানজট প্রকট হচ্ছে। মতিঝিলের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিপণন বিভাগের কর্মকর্তা লতিফুর রহমান বলেন, বাইকের চাকা না ঘুরলে আমাদের চাকরি থাকে না। তেলের লাইনে দাঁড়ালে চার-পাঁচ ঘণ্টা ব্যয় হচ্ছে।

ই-কমার্স খাতের মেরুদণ্ড হলো মোটরসাইকেলে পণ্য সরবরাহ। ধানমন্ডির এক ক্ষুদ্র অনলাইন শপের উদ্যোক্তা শাহনাজ বেগম জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানের ছয়জন ডেলিভারি ম্যানের তিনজনই এখন প্রতিদিন তেলের লাইনে ৪-৫ ঘণ্টা বসে থাকেন। আগে গ্রাহককে বলতাম, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য পৌঁছাবে, এখন তিন দিন সময় নিচ্ছি। তেলের অভাবে শুধু যাতায়াত না, পুরো ব্যবসার রুটিনটাই পাল্টে গেছে। গ্রাহকরা অর্ডার বাতিল করছেন।

সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার রুটিনও এখন তেলের লাইনের কাছে জিম্মি। অনেক বেসরকারি স্কুলবাসও তেলের সংকটে সময়মতো ট্রিপ দিতে পারছে না, ফলে অনেক শিক্ষার্থীকে গরমে হেঁটে বা রিকশায় স্কুলে যেতে হচ্ছে। মিরপুরের বাসিন্দা তৌফিকুর রহমান প্রতিদিন তাঁর ছেলেকে মোটরসাইকেলে করে স্কুলে পৌঁছে দেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে ছেলেকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে আমি অফিসের বদলে তেলের পাম্পে সিরিয়াল দিই।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে জরুরি স্বাস্থ্যসেবায়। ঢাকার বাইরে অনেক এলাকায় ডিজেল সংকটে জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না, ফলে অস্ত্রোপচারের মতো জরুরি কাজগুলোতেও বিঘ্ন ঘটছে। রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স চালক কালাম বলেন, হুটহাট কোনো রোগীকে জরুরিভিত্তিতে অন্য হাসপাতালে নেওয়া মুশকিল হয়ে গেছে। পাম্পে তেল পেতে ৭-৮ ঘণ্টা লাগছে।

তেলের সংকটের সুযোগ নিয়ে সিএনজি অটোরিকশা ও রিকশাচালকরা দ্বিগুণ ভাড়া হাঁকছেন। মতিঝিলে অফিস করা শরিফুল ইসলাম বলেন, নিজের মোটরসাইকেল তেলের অভাবে গ্যারেজে ফেলে রেখেছি। এখন অফিসে সময় খরচ দুটাই বেড়েছে। বাসে উঠতে পারি না অতিরিক্ত ভিড়ের জন্য, আর সিএনজিওয়ালারা ৩০০ টাকার ভাড়া চাচ্ছে ৬০০ টাকা। তেলের সংকটে মাসের বাজেটের চিত্রে চাপ বেড়েছে।

ঢাকার বাইরের সংকট আরও বেশি কষ্টকর। রংপুর বিভাগের পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, তেলের অভাবে বিভাগের অর্ধেকের বেশি পাম্প ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। রংপুর নগরীর শাপলা এলাকার স্কুলশিক্ষক ওবায়েদ ইসলাম বিরক্তির সুরে বলেন, দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তেল দেওয়ার সময়টা একেবারেই অবাস্তব। আমরা যারা চাকরি করি, তারা ওই সময়ে লাইনে দাঁড়াব কীভাবে?

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় করতোয়া নদীর খেয়াঘাটে দেখা গেছে এক বিস্ময়কর চিত্র। তেলের অভাবে ইঞ্জিনচালিত নৌকা এখন দড়ি টেনে চালানো হচ্ছে। মাঝিরা নদীর দুই পারে বাঁশের খুঁটি গেঁড়ে দড়ি বেঁধে টেনে নৌকা পার করছেন। ঘাট মাঝি আব্দুল লতিফ বলেন, ‘প্রতিদিন তিন লিটার তেল দরকার, পাচ্ছি এক লিটার। বাধ্য হয়ে হাত দিয়ে দড়ি টেনে নৌকা বাইতেছি। ২০ হাজার মানুষের যাতায়াত এই ঘাটে, সময় লাগছে আগের চেয়ে দ্বিগুণ।’

ভারত থেকে ডিজেল আমদানি
ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোতে শুক্রবার  মধ্যরাতে আট হাজার টন ডিজেল এসে পৌঁছেছে। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপক কাজী মো. রবিউল আলম জানিয়েছেন, আগামী ১৭ এপ্রিল আরও পাঁচ হাজার টনের একটি চালান আসার কথা রয়েছে। চলতি এপ্রিলে এই পাইপলাইনের মাধ্যমে মোট ৪০ হাজার  টন জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়া চলছে।

ফুয়েল পাস অ্যাপে বিড়ম্বনা
তেল বিতরণে স্বচ্ছতা আনতে সরকার পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ চালু করেছে। রাজধানীর আসাদগেট ও তেজগাঁওয়ের দুটি পাম্পে এই পদ্ধতি চালু হলেও নিবন্ধন জটিলতায় সাধারণ মানুষ নাজেহাল হচ্ছে। চালকরা বলছেন, ফুয়েল পাসেও লাইন ধরতে হচ্ছে।

(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here