সংসদ অধিবেশন ঘটনাবহুল অধিবেশন, কিছু সংস্কার থমকে গেল

0
5

অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টির অনুমোদন দেয়নি জাতীয় সংসদ। অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদিত না হওয়ায় ১৩টি অধ্যাদেশ অকার্যকর হয়ে গেছে। বাকি সাতটি অধ্যাদেশ চারটি বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে সংসদের ঘটনাবহুল প্রথম অধিবেশনের এক মাসে গুম প্রতিরোধ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদ্যোগ থমকে গেছে।

সংসদের বিরোধী দল বিষয়টিকে জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে প্রতারণা বলে আখ্যা দিয়েছে। নাগরিক সমাজ সমালোচনা করছে। তবে সরকারি দল বলছে, সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। সংবিধান অনুযায়ী, আইনে রূপান্তরিত করতে সংসদে বিল উত্থাপন না করায় ১৩টি অধ্যাদেশ গতকাল শনিবার প্রথম প্রহরে অকার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে গণভোট, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন, তথ্য অধিকার, পুলিশ কমিশন, রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত সংস্কারের সাতটি আলোচিত অধ্যাদেশ রয়েছে।

এ ছাড়া বিল পাসের মাধ্যমে বাতিল করা অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগ আইন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার কমিশন সংস্কারের মতো বিষয় রয়েছে।

৮৭টি বিলের মাধ্যমে সরকারি দল অন্তর্বর্তী সরকারের যে ১১৩টি অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে তার মধ্যে কিছু অধ্যাদেশ রয়েছে যেগুলো জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে জারি করা হয়েছিল। সেই অধ্যাদেশগুলো সরকারি দল বিল আকারে পাস করেছে। যেমন স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কারণ দর্শানো ছাড়াই অপসারণ এবং প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা দিয়ে চারটি অধ্যাদেশ পাস করা হয়েছে।

এ ছাড়া ওয়াসার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কর্মচারীদের কারণ দর্শানো ছাড়াই ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে বা জনস্বার্থে’ অপসারণের ক্ষমতা সরকারকে দিয়ে জারি অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করতে বিল পাস করানো হয়েছে। আন্দোলন দমনে সরকারি কর্মচারীদের দ্রুততম সময়ে বরখাস্ত করার অধ্যাদেশগুলোও সংসদ অনুমোদন করেছে।

তিন ফসলি জমিতে তামাক চাষ নিষিদ্ধের ভূমি ব্যবহার-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ সংশোধন করে পাস করানো হয়েছে। ফলে এসব জমিতে তামাক চাষ করা যাবে। আবার তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ সংশোধন করে ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণকে শিথিল করা হয়েছে।

বাক্‌স্বাধীনতা ও সরকারের সমালোচনার সুযোগ তৈরি সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ হুবহু পাস করা হয়েছে। ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা, বাণিজ্যিক আদালত, আইনগত সহায়তা, ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন এবং দেওয়ানি কার্যবিধি সংশোধনের সংস্কারমূলক অধ্যাদেশগুলোকেও আইনে পরিণত করতে বিল পাস করা হয়েছে।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, জনগণের অধিকার আবার পায়ের তলায় পিষ্ট করার পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। সংসদে ফিরব। তবে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তির আন্দোলন গড়ে তুলব। চুল পরিমাণ ছাড় দেব না।

বিএনপির বিরুদ্ধে ওয়াদা ভঙ্গের অভিযোগ করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম গতকাল সরকারকে সতর্ক করে বলেছেন, ছাত্র-জনতার রক্তের সঙ্গে ওয়াদা ভঙ্গের পরিণতি তাদের অচিরেই ভোগ করতে হবে।

প্রশ্ন গণভোট নিয়ে
বিরোধীদের অব্যাহত দাবির মুখেও গত ২৫ নভেম্বর জারি করা গণভোট অধ্যাদেশ পাস করেনি বিএনপি সরকার। এই অধ্যাদেশের অধীনেই গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ওপর গণভোট হয়েছে।

জুলাই আদেশকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল বলে আখ্যা দিলেও অধ্যাদেশ পাস না করানোর ব্যাখ্যায় তিনি ৪ এপ্রিল বলেছেন, গণভোট যেহেতু হয়ে গেছে, অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের প্রয়োজন নেই।

১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ হ্যাঁ ভোট পেয়ে জুলাই আদেশ এবং জুলাই সনদে বর্ণিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো অনুমোদন পায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও নির্বাচনের প্রচারে হ্যাঁ ভোট চেয়েছিলেন। সংসদে মুলতবি প্রস্তাবে দুই দফা বিতর্ক হলেও বিএনপির কেউ স্পষ্ট করেননি– গণভোটের ফল মানবেন কিনা। দলটির মন্ত্রীরা বারবার বলেছেন, গত বছরের ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী সংস্কার করা হবে।

গণভোটের ফল অনুযায়ী সংস্কারের দাবিতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আন্দোলন নেমেছে। অধ্যাদেশ পাস না করার বিষয়ে ১১ দলের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেন, যে গণভোট সরকারের বৈধতা, সেই অধ্যাদেশ বাতিল করা হলো। এখন হয়তো বলা হবে, গণভোটও অবৈধ।

ঐকমত্য কমিশনের পরামর্শক কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক বলেন, অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল শুধু গণভোট আয়োজনে, যা হয়ে গেছে। ফলে অধ্যাদেশ পাস না হলেও গণভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন নেই।

সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়, বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশগুলো বাতিল হলেও এসবের অধীনে যেসব কাজ অতীতে হয়েছে, সেগুলোর বৈধতা দিতে বিল পাস করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান সিদ্দিক বলেন, গণভোট অধ্যাদেশের ক্ষেত্রেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা যেত। তা না হওয়ায় কিছু আইনি প্রশ্ন হয়তো উঠবে।

গত বছরের ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই আদেশও তোলা হয়নি সংসদে। সরকার ও বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির ক্ষমতা নেই। সুতরাং আদেশটি শুরু থেকেই অবৈধ ছিল। ইমরান সিদ্দিক বলেছেন, আদেশ পাস করার প্রয়োজন নেই। আদেশের ওপর গণভোট হয়ে গেছে।

অধ্যাদেশ অকার্যকরে যা হবে
অধ্যাদেশ অকার্যকর হওয়ায় এতে গুম প্রতিরোধে পৃথক আইন আর থাকছে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে হবে গুমের বিচার। অধ্যাদেশ অকার্যকর হওয়ায় দুদকের ২০০৪ আইনে ৩২(ক) ধারা শনিবার রাত থেকে ফিরেছে। ফলে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা করতে হলে অনুমতি নিতে হবে।

সরকারি নথিকে তথ্য হিসেবে ঘোষণা করায় প্রকাশের যে বাধ্যবাধকতা করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার, অধ্যাদেশ অকার্যকর হওয়ায় তা আর থাকছে না। তাই সরকারকে এসব তথ্য প্রকাশ করতে হবে না।

পুলিশের যে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে নাগরিকের অভিযোগ তদন্ত এবং পুলিশের সুরক্ষায় সুপারিশের দায়িত্ব দিয়ে কমিশন গঠনের যে বিধান করা হয়েছিল, অধ্যাদেশ অকার্যকর হওয়ায় সেটিও থাকছে না। ফলে পুলিশ কমিশন গঠনের আগেই বিলোপ হয়ে গেল।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কারে গত বছর সংস্থাটিকে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। এই সুপারিশ কয়েক দশক ধরে থাকলেও এনবিআরের কর্মকর্তারা এই সংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে কর আদায় বন্ধ করেছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশটি অকার্যকর হওয়ায় এনবিআর আগের ব্যবস্থায় ফিরবে।

অধ্যাদেশ বাতিলে যা হবে
মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০০৯ সালের আইন ফিরিয়েছে সরকার। ফলে মানবাধিকার কমিশনে চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগের বাছাই কমিটিতে আবার সরকারের প্রাধান্য ফিরছে। কমিটির ছয় সদস্যের পাঁচজনই হবেন সরকার এবং সরকারি দলের। ফলে সরকারের পছন্দে নিয়োগ হবে।

অধিকাংশ মানবাধিকার লঙ্ঘন সরকারি ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী সংস্থার বিরুদ্ধে থাকলেও ২০০৯ সালের আইনের ১৮ ধারায় বলা হয়েছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্ত করতে পারবে না মানবাধিকার কমিশন। মানবাধিকার লঙ্ঘনে অভিযোগ পেলে কমিশন শুধু সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে। এরপর প্রয়োজন মনে করলে কমিশন শাস্তির সুপারিশ করতে পারবে।

অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় পুরোনো এ বিধান আবার ফিরেছে। অধ্যাদেশে কমিশনকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সরকারি কর্মচারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত, সরকারের অনুমতি ছাড়া গ্রেপ্তার এবং শাস্তির সুপারিশের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।

অধ্যাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণ হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পক্ষ হয়ে কমিশনকে ক্ষতিপূরণ বা জরিমানার টাকা আদায়ের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, কমিশনের আদেশ যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান মানতে বাধ্য থাকবেন। না মানলে সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে অদক্ষতা ও অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে। চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে কমিশন। অধ্যাদেশ বাতিলে এসব ক্ষমতা আর থাকছে না কমিশনের।

অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগও আগের নিয়মে ফিরছে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কাউন্সিল নয়, প্রধানমন্ত্রী পরামর্শে আবারও বিচাপতি নিয়োগ হবে। সচিবালয় বিলুপ্তের ফলে আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে ফিরছে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরি, বদলি, পদোন্নতি ও শাস্তির ক্ষমতা। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশে এ ক্ষমতা প্রধান বিচারপতি নিয়ন্ত্রণাধীন বিচার বিভাগ সচিবালয়কে দেওয়া হয়েছিল। অধ্যাদেশ বাতিলের ফলে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর উদ্বোধন করা সচিবালয় আইনিভাবে গতকাল বিলুপ্ত হয়েছে।

সুসাশনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যে অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহির মতো আসল সংস্কার হতো, সেগুলোই বাদ দেওয়া হয়েছে। যেসব অধ্যাদেশে সরকারের ক্ষমতা বেড়েছে, সেগুলো আইনে পরিণত করা হয়েছে। উল্টোপথে যাত্রা শুরু হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here