মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া জ্বালানি তেলের সংকটের বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে দেশের নৌপরিবহন খাতে। চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় অধিকাংশ নৌযান বসে থাকছে। বাকিগুলো চালাতে হচ্ছে পালা করে। এতে যাত্রীসেবার চেয়ে বড় চাপ তৈরি হয়েছে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায়। সারাদেশে পণ্য সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ইরানে হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে ডিজেলের সরবরাহ সীমিত হয়ে গেছে। ডিপো থেকে চাহিদার অর্ধেকের বেশি তেল সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে পণ্য পরিবহনের গতি কমে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তরীণ গন্তব্যগুলোতে নৌ চলাচল অনেক কমে গেছে।
পাশাপাশি সারাদেশে ৪০টির লঞ্চের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অনেক বন্ধ হওয়ার পথে বলে আমাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন। রাজধানীর চিত্রও প্রায় একই রকম। ঢাকার সদরঘাট থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩৮টি নৌপথে রোটেশনের মাধ্যমে লঞ্চ চলাচল করতে হচ্ছে। কোনো কোনো রুটে ট্রিপ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন লঞ্চ মালিকরা।
লঞ্চ মালিকদের সংগঠনের তথ্যমতে, সারাদেশে লঞ্চ চলাচলে চার লাখ টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। লঞ্চ মালিকরা বলছেন, সড়কপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে বেশ কয়েক বছর ধরে নৌপথে যাত্রী সংকট। তাই আগে থেকেই নৌরুটগুলোতে লঞ্চের সংখ্যা কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল সংকট হওয়ায় আরও ধস নেমেছে এই খাতে। পরিস্থিতির উত্তরণ না ঘটলে স্থায়ীভাবে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে পারেন অনেকে।
বন্দর পরিস্থিতি
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বেসরকারি অপারেটর ও শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মালিকানাধীন প্রায় আড়াই হাজার লাইটার জাহাজ চলাচল করে দেশের বিভিন্ন নৌপথে। এগুলো পরিচালনার জন্য দৈনিক গড়ে প্রায় আড়াই লাখ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু ৫০ হাজার লিটারের মতো সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিআইডব্লিউটিসিসি) সূত্র জানায়, জ্বালানি তেল সংকটের কারণে জাহাজ পরিচালনার দৈনন্দিন পরিকল্পনাও ব্যাহত হচ্ছে। সংস্থাটির অধীনে থাকা প্রায় এক হাজার ৫০টি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সারাদেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পরিবহন করে থাকে। দৈনিক ৮০টি জাহাজ পণ্য পরিবহনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতিদিন বরাদ্দ সভা করে জাহাজ নির্ধারণ করা হতো। কিন্তু তেল সংকটের কারণে দুদিন পরপর বরাদ্দ সভা করা হচ্ছে। যেসব জাহাজ তেল পাচ্ছে, পালা করে সেগুলোকে পণ্য পরিবহনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে গভীর ড্রাফটের বিদেশি বড় জাহাজ নোঙর করার পর সেখান থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করা হয়। বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের এই কাজে নিয়োজিত ১০০ থেকে ১৫০ লাইটার জাহাজ। এখান থেকে পণ্য নিয়ে দেশের ৫২টি ঘাটে যায় আরও পাঁচ শতাধিক লাইটার। এসব ছোট জাহাজে প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ লিটার ডিজেলের চাহিদা আছে। কিন্তু মিলছে ৬০ হাজার লিটারের মতো। পাশাপাশি জ্বালানি সংকটের কারণে বন্দরে আসা বিদেশি বড় জাহাজগুলোকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে বহির্নোঙরে। এই অপেক্ষার জন্য প্রতিদিন তাদের ক্ষতি গুনতে হচ্ছে কমপক্ষে ২০ হাজার ডলার বা ২২ লাখ টাকা। বন্দরের বহির্নোঙরে গতকালও এমন বড় জাহাজ ছিল অর্ধশত।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে আসা পণ্যের ৭০ শতাংশের বেশি খালাস করা হয় বহির্নোঙরে। জেটিতে ড্রাফট কম থাকায় বড় জাহাজগুলো সেখানে লাইটারের মাধ্যমে পণ্য খালাস করে। চাহিদামতো লাইটার জাহাজ না মেলায় তার প্রভাব পড়ে বন্দরের সার্বিক কার্যক্রমে। ক্ষতির মুখে পড়ে জাহাজ মালিক ও আমদানিকারকরা।
ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের মাধ্যমে লাইটার জাহাজের বুকিং নেওয়া হয় প্রতিদিন। শিল্প মালিকদেরও লাইটার জাহাজ আছে। তারা নিজেদের পণ্য আনা-নেওয়া করতে সেগুলো স্বতন্ত্রভাবে পরিচালনা করে। লাইটার জাহাজ দিয়ে বন্দরের বহির্নোঙর থেকে পণ্য নেওয়া হয় চট্টগ্রামের বেসরকারি ১৬টি ঘাটে। পণ্য যায় নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, নিতাইগঞ্জসহ দেশের ৫২টি ঘাটে। চাল-ডাল-তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যায় এগুলোতে। নেওয়া হয় সিমেন্ট ক্লিংকার, কয়লাসহ শিল্পকারখানার কাজে ব্যবহৃত কাঁচামালও। সারাদেশে সচল থাকা এমন লাইটার জাহাজ আছে সহস্রাধিক।
ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের মুখপাত্র মিউচুয়াল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভেজ আহমেদ বলেন, চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি পাচ্ছি আমরা। অথচ নৌ বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালনা করতে হয় আমাদেরই। চাহিদামতো জ্বালানি না পাওয়াতে প্রত্যাশা অনুযায়ী দিতে পারছি না বুকিং। এতে পুরো বাণিজ্য বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
লঞ্চ পরিস্থিতি
লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত মার্চের শুরু থেকে তেল সংকট দেখা দেওয়ায় ঈদুল ফিতরের সময় নৌপথে ঘরমুখো যাত্রীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারেননি তারা। সংকট সমাধানে নৌপরিবহন এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ছাড়াও নৌপথে তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেঘনা পেট্রোলিয়ামের নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপো কর্তৃপক্ষকে জরুরি চিঠি দিয়েছিল লঞ্চ মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল সংস্থা এবং নৌযানে তেল সরবরাহকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ রিভার ফুয়েল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন। কিন্তু সংকট নিরসন হয়নি। তাই ঈদের সময়ই রাজধানীর সদরঘাট টার্মিনালসহ বিভিন্ন টার্মিনাল ও লঞ্চঘাট থেকে কয়েকটি রুটের চলাচল বাতিল করতে হয়।
ঢাকা নদীবন্দরের সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩৮টি রুটে চলাচলকারী ১৪০টি আন্তঃজেলা ও ছোট-বড় লঞ্চ চলাচল করে। লঞ্চ মালিকদের দুটি সংগঠনের অধীন চলাচলকারী এসব লঞ্চের ডিজেলের চাহিদা রয়েছে প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন লাখ লিটার। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, চাঁদপুর, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, ভৈরব, আরিচা ইত্যাদি লঞ্চ টার্মিনাল অথবা ঘাট থেকে চলাচলকারী লোকাল (স্থানীয়) অর্ধশতাধিক লঞ্চের জন্য ডিজেলের চাহিদা প্রতিদিন এক লাখ লিটারের মতো। সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় চার লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে সদরঘাটের ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় ৬০ ভাগ ডিজেল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। অন্যান্য জায়গায় চাহিদার তুলনায় অর্ধেক সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।
এরই মধ্যে সদরঘাট ছাড়াও বেশ কয়েকটি লঞ্চ টার্মিনাল ও ঘাট থেকে আন্তঃজেলা ও লোকাল লঞ্চের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে পাঁচটি ও বরিশাল থেকে চার থেকে ছয়টিসহ ৪০টির মতো স্থানীয় ও ছোট লঞ্চের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাপ) সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বদিউজ্জামান বাদল সমকালকে বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে প্রায় এক মাস ধরে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না তারা। কোথাও কোথাও চাহিদার অর্ধেক তেলও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকে স্থানীয় পাওয়ার টিলারের তেলের ডিলারসহ খুচরা দোকান থেকে ডিজেল কিনে লোকসান দিয়ে হলেও যাত্রীসেবা চালু রাখার চেষ্টা করছেন। তেলের অভাবে অনেক রুটের লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। বাধ্য হয়ে কয়েকটি রুটে চালু করা হয়েছে রোটেশন পদ্ধতি।
যাপের মহাসচিব সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে গত শনিবার জরুরি বৈঠক করেছে তাদের সংগঠন। কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির এই বৈঠকে ঈদুল আজহার সময় আগামী জুনে তেল সংকট আরও বাড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন মালিকরা। কেননা সে সময় সারাদেশে তেলের চাহিদা পাঁচ লাখ লিটার ছাড়াবে। এই কারণে বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈদুল আজহায় আগাম সতর্কতা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে চিঠি দেবেন তারা।
ঢাকা-বরিশাল রুটের সুন্দরবন নেভিগেশনের মালিক আকতার হোসেন বলেন, রাউন্ড ট্রিপে (যাওয়া-আসা) একটি লঞ্চে ছয় থেকে সাত হাজার লিটার তেল লাগে। নিয়মিত চলাচলকারী তিনটি লঞ্চে দৈনিক গড়ে ১৮ থেকে ২১ হাজার লিটার তেল লাগলেও বর্তমানে ১২-১৪ হাজার লিটারের বেশি পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে রোটেশন করে একটি বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। সংকট না কমলে লঞ্চ চালানো অব্যাহত রাখতে পারব কিনা সন্দেহ হয়।
ঢাকা-ভোলা রুটে চলাচলকারী গ্রিনলাইন ওয়াটার ভেসেলের জিএম আবদুস সাত্তার বলেন, প্রতিদিন তাদের দুটি ওয়াটার বাস চলাচল করে এই রুটে। জ্বালানি সংকটের কারণে ঈদের আগে-পরে একটি ওয়াটার বাস চালাতে হয়েছে তাদের। চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়া পর্যন্ত জাহাজ চালানো সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশ রিভার ফুয়েল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশেনের সভাপতি জি এম সরোয়ার বলেন, ডিপো থেকে তেল পাওয়ার পর অ্যাসোসিয়েশনের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ১৬-১৭টি মিনি ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে লঞ্চগুলোতে ডিজেল সরবরাহ করা হয়। নিয়মিত চলাচলে সদরঘাট থেকে দেশের ৩৮টি রুটে চলাচলকারী লঞ্চগুলোর প্রতিদিন দরকার পড়ে দুই-তিন লাখ লিটার ডিজেল। কিন্তু ডিপো থেকে এই চাহিদার তুলনায় অনেক কম তেল পাচ্ছি আমরা। এ নিয়ে ঈদুল ফিতরের আগে ডিপো কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। তারপরও বাড়েনি তেল সরবরাহ। সংকট না কাটলে আমাদের পক্ষে ব্যবসা চালিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ফতুল্লা ডিপোর সুপারভাইজার জালাল উদ্দিন বলেন, নৌপরিবহনসহ সব খাতে জ্বালানি তেলের সংকট নিরসনের বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা চলছে। আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।




