চৈত্রসংক্রান্তি আজ অদেখা নতুনের দিকে এগিয়ে যাওয়া

0
12

আজ চৈত্রসংক্রান্তি। বছরের শেষ দিন। নতুন বছরের সঙ্গে যার এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন। পুরোনো সময়ের ধুলো মুছে, অদেখা নতুনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার হাতছানি। ঋতু বদলায়, মাটি তার ভেতরে নতুন বীজের জন্য জায়গা করে দেয়। সেই অদৃশ্য পরিবর্তনের মুহূর্তটির নামই চৈত্রসংক্রান্তি।

বাংলা বছরের হিসাব চলে সূর্যের গতিপথ ধরে, একটি সৌরচক্রের ভেতর দিয়ে। সেই হিসাবে চৈত্র মাসের শেষ দিনটি কোনো সমাপ্তি নয়, বরং এক সঞ্চারপর্ব। ‘সংক্রান্তি’ শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এই গমন। এক কিনারা থেকে অন্য কিনারায় যাওয়া। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায়, আজ সূর্য মীন রাশি ছেড়ে মেষে প্রবেশ করছে। সনাতন পঞ্জিকায় তাই দিনটি ‘মহাবিষুব সংক্রান্তি’।

চৈত্রসংক্রান্তিকে ঘিরে প্রচলিত আলোচনা সাধারণত মেলা, গাজন বা চড়ক পূজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এর ভেতরে রয়েছে আরও গভীর এক ভাবনা। নিজেকে, প্রকৃতিকে এবং সময়কে নতুন করে বোঝার চেষ্টা।

কৃষিনির্ভর বাংলায় চৈত্র ছিল অনিশ্চয়তার মাস। খরতাপে শুকিয়ে যাওয়া জমি, বৃষ্টির প্রতীক্ষা এবং ফসলের অপেক্ষা। সব মিলিয়ে মানুষের জীবন তখন প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতায় সূর্যের প্রতি প্রার্থনা, বৃষ্টির আহ্বান এবং নতুন বছরের প্রস্তুতি– সবই একসঙ্গে মিশে যায় চৈত্রসংক্রান্তিতে।

এই প্রক্রিয়ায় নারীর ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। গৃহস্থালির ভেতর খাদ্য প্রস্তুতি, ব্রত বা আচার। এসবের মধ্য দিয়ে নারীই হয়ে উঠতেন প্রকৃতি ও পরিবারের সংযোগরেখা। ফলে উৎসবটি কেবল বাহ্যিক নয়, ছিল এক গভীর জীবনচর্চা।

একসময় চৈত্রসংক্রান্তি মানেই ছিল গ্রামবাংলার প্রাণের উৎসব। গৃহস্থরা মেয়েজামাই ও নাতি-নাতনিদের আমন্ত্রণ জানাতেন, নতুন পোশাক দেওয়া হতো, কয়েক দিন ধরে চলত আপ্যায়ন। এই সময়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মেলা। যেখানে কুটিরশিল্প, মাটির খেলনা, লোকজ মিষ্টি আর বিনোদনের সমাহার ঘটত।

বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলেছে। শহুরে জীবনের প্রভাবে গ্রামীণ ঐতিহ্যের ধারায় পরিবর্তন এলেও তা বিলীন হয়নি। গ্রামে ও বাজারে এখনও মেলা বসে। নতুন রূপে শহরেও বসছে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা। ঢাকা শহরজুড়ে চলে সাপ্তাহিক মেলা। রাজধানীর আশপাশে ও বিভাগীয় শহরগুলোও এখন সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মেলার পসরা সাজিয়ে বসে।

একদিকে লাঠিখেলা, সঙযাত্রা, রায়বেশে নৃত্য, আবৃত্তি; অন্যদিকে পহেলা বৈশাখে ব্যবসায়ীদের হালখাতার প্রস্তুতি। দুটো দিক একত্রিত হয়ে এক সর্বজনীন সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

চৈত্রসংক্রান্তির অন্যতম দৃশ্যমান দিক হলো গাজন ও চড়ক উৎসব। শিবভক্ত সন্ন্যাসীরা মাসজুড়ে সাধনার পর এদিন কঠোর দেহকৌশলের মাধ্যমে ভক্তি প্রকাশ করেন। শূল ফোঁড়া, বাণ ফোঁড়া বা বড়শি গাঁথা অবস্থায় চড়কগাছে ঘোরা– এসব আচার ধর্মীয় বিশ্বাসের চরম বহিঃপ্রকাশ। বহু শতাব্দী ধরে বাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে এই অনুশীলন টিকে আছে এখনও।

চৈত্রসংক্রান্তির খাদ্যাভ্যাসেও রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। আজকের দিনে ১৪ রকম শাক খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। বিশেষত তিতা স্বাদের খাবার। যেমন– নিমপাতা, করলা বা গিমা শাক। মূলত অনাবাদি শাকগুলো একসঙ্গে রান্না করে খাওয়া হয়। এই বিশেষ প্রচলনটি গ্রামাঞ্চলে এখনও টিকে আছে।

মূলত, শরীরকে নতুন ঋতুর জন্য প্রস্তুত করে বলে বিশ্বাস করা হয় এই খাদ্য প্রচলনের মধ্য দিয়ে। আবার কোথাও ছাতু, দই-চিড়া, আবার কোথাও নানা পিঠা ও মিষ্টির আয়োজন দেখা যায়। এই খাদ্যসংস্কৃতি আসলে প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার এক প্রাচীন জ্ঞানচর্চা।

চৈত্রসংক্রান্তির সময়টিতে পার্বত্য অঞ্চলের নৃগোষ্ঠীগুলোও বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের উৎসবে মেতে ওঠে। ত্রিপুরাদের বৈসুক, মারমাদের সাংগ্রাই এবং চাকমাদের বিজু– এই তিন উৎসব মিলিয়ে পরিচিত বৈসাবি নামে। এই উৎসবে নতুন পোশাক, ফুল দিয়ে ঘর সাজানো, পিঠা-পায়েস তৈরি এবং ‘পাঁচন’ রান্না করা হয়। সাংগ্রাইয়ের জলোৎসব কিংবা বিজুর ফুলবিজু-মূলবিজুর মতো আয়োজনগুলো আনন্দ ও বিশ্বাসের মেলবন্ধন তৈরি করে।

তাদের বিশ্বাস, তেতো ও মিষ্টির সংমিশ্রণে বছর শেষ করলে পুরোনো দুঃখ মুছে যায় এবং নতুন বছর শুভ হয়ে ওঠে।

সনাতন ধর্মমতে, চৈত্রসংক্রান্তি অত্যন্ত পুণ্যময় দিন। উপবাস, দান, ব্রত ও স্নান– এসবকে এই দিনে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হয়। তবে চৈত্রসংক্রান্তি কেবল ধর্মীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বাঙালির এক অসাম্প্রদায়িক সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।

অতীতে মুসলিম সমাজেও এদিন খোলা মাঠে সম্মিলিত প্রার্থনা বা শিরনি বিতরণের প্রচলন ছিল। যা এই দিনের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক চরিত্রকে নির্দেশ করে।

বাংলা সনের বর্তমান রূপের পেছনেও রয়েছে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। মুঘল সম্রাট আকবর কৃষি ও খাজনা ব্যবস্থাকে সহজ করতে নতুন বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। তাঁর নির্দেশে জ্যোতির্বিদ ফতেহউল্লাহ্‌ সিরাজী সৌর ও চান্দ্র পদ্ধতির সমন্বয়ে বাংলা সনের কাঠামো নির্ধারণ করেন। এর ফলে বৈশাখ বছরের প্রথম মাস এবং চৈত্র শেষ মাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here