ঋণের আওতা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আরও ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল চেয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। একই সঙ্গে পরিপূর্ণ তপশিলি ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা এবং রেমিট্যান্স আহরণ সুবিধা চালু করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। এ জন্য কোর ব্যাংকিং সলিউশন (সিবিএস) স্থাপন, সিআরআর, এসএলআর সংরক্ষণের মতো সক্ষমতা অর্জনসহ নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে সহযোগিতা চেয়েছে ব্যাংকটি।
জানা গেছে, বিএনপি সরকারের প্রথম দেড় বছরে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ব্যাংকটিকে আরও গতিশীল করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। জাপানসহ বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত মাসের প্রথম সপ্তাহে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি বৈঠক হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সভাকক্ষে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের এমডি ওয়াহিদা বেগম বিভিন্ন বিষয়ের ওপর একটি লিখিত প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। ব্যাংকটির প্রস্তাবনার বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে একটি প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালককে সভাপতি করে একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত বৈঠকে লিখিত প্রস্তাবনায় তিন ধাপে সমস্যা সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে বলা হয়–স্বল্প মেয়াদে সমাধানের জন্য দ্রুততম সময়ে ব্যাংকের তহবিল সংকট সমাধান করতে হবে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক গতানুগতিক ব্যাংকের বাইরে কোনো ধরনের জামানত ছাড়া ঋণ দেয়। ফলে ব্যাংকটির ঋণ শ্রেণীকরণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়ম থেকে ছাড় দিতে হবে। আন্তঃব্যাংক লেনদেন চালুর অনুমোদন এবং দ্রুত জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে ১২২টি শাখার মধ্যে ৬২টি শাখা মাত্র দুজন করে জনবল নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসসহ বিভিন্ন রেমিট্যান্স সেবা চালু করার কথা বলা হয়েছে। মধ্য মেয়াদে শাখাসহ ব্যাংকের সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পূর্ণাঙ্গ তপশিলি ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরুর অনুমোদন ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদি প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে– তপশিলি ব্যাংকে রূপান্তরের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হলেও দীর্ঘ মেয়াদে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব হবে।
সরাসরি টাকা দেবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক
জানা গেছে, সরকারের গ্যারান্টির বিপরীতে বর্তমানে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ২ হাজার কোটি টাকার প্রি-ফাইন্যান্স তহবিল রয়েছে। ব্যাংক রেট তথা ৪ শতাংশ সুদে এ তহবিল দেওয়া হয়। এখান থেকে এক হাজার ৮৭০ কোটি টাকা বিতরণ করেছে ব্যাংকটি। বিদেশে যাওয়ার আগে ২ থেকে ৫ বছর মেয়াদি অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়। বর্তমানে ১১ শতাংশ সুদে এ অর্থ বিতরণ করা হচ্ছে। বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে বিশেষ দক্ষতা অর্জনের জন্য ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। জাপানে লোক পাঠানোর জন্য ভাষা শিক্ষাসহ অন্যান্য দক্ষতার জন্য দ্রুততম সময়ে ঋণ কার্যক্রম জোরদার করতে চায় ব্যাংকটি। এজন্য নতুন করে ২ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বিদ্যমান তহবিলের আকার বাড়িয়ে ৩ হাজার কোটি টাকা করা এবং দক্ষতা কর্মসূচির জন্য এক হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরাসরি প্রাক-অর্থায়ন করলে তা টাকা ছাপানোর মতো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। বর্তমানের উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় যা সামঞ্জস্যপূর্ণ না। আবার আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির সঙ্গে এ ধরনের অর্থায়ন অসামঞ্জ্যপূর্ণ। যে কারণে এই মুহূর্তে সরাসরি কোনো তহবিল সহায়তা দেবে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অবশ্য আগের মতো অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে গ্যারান্টি ইস্যু হলে সে ক্ষেত্রে তহবিল ছাড় করা হতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি বাস্তবতায় এক্ষেত্রে বৈঠকে সবাই একমত হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রবাসীদের কষ্টার্জিত আয় বৈধ পথে সহজে বাংলাদেশে আনা এবং বিদেশে যেতে সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে নিজেদের ঋণের কিস্তি এখনও সরাসরি আদায় করতে পারে না ব্যাংকটি। মূলত কোর ব্যাংকিং সলিউশন না থাকায় অন্য ব্যাংকের সহায়তায় কার্যক্রম চালাতে হয়। এখনও বাংলাদেশ ব্যাংকের আন্তঃব্যাংক লেনদেন প্ল্যাটফর্মেও যুক্ত হতে পারেনি ব্যাংকটি। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদ্যমান অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বিএসিপিএস, বিইএফটিএন, আরটিজিএস ও এনবিএসবিতে যুক্ত হওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মোট ঋণ রয়েছে তিন হাজার ১৭৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৪১৮ কোটি টাকা। মোট ঋণের যা ১৩ দশমিক ১৬ শতাংশ। ব্যাংকটির ২১০ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটি কোনো আমানত নেয় না। সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তহবিল নিয়ে পরিচালিত হয়। আবার বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণের কোনো বাধ্যবাধকতা মানতে হয় না। সাধারণভাবে প্রচলিত ধারার একটি ব্যাংকের যেখানে ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে সিএরআর ৪ টাকা এবং এসএলআর হিসেবে ১৩ টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখতে হয়।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক আইন-২০১০ এর মাধ্যমে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠিত হয়। কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে গমনেচ্ছু বাংলাদেশি কর্মীদের ঋণ সহায়তা, প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে ফেরার পর কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে ঋণ, দেশে বিনিয়োগে উৎসাহিতকরণ এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত ও ব্যয়-সাশ্রয়ী পন্থায় সহজে রেমিট্যান্স পাঠানোয় সহায়তা করার লক্ষ্যে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাংকটি যাত্রা করে। ২০১৮ সালের জুলাইতে ব্যাংকটি তপশিলি ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত হলেও আজ পর্যন্ত তপশিলি কার্যক্রম চালু করেনি।




