অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি ও অনলাইন জুয়াড়িদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আগাম ঘোষণা দিয়ে ১ মে থেকে দেশব্যাপী এই অভিযান চলছে।
গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ সদরদপ্তর থেকে প্রাপ্ত বিশেষ অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রথম পাঁচ দিনে সারাদেশে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুই হাজার ৬২২ জনকে। তাদের মধ্যে রাজধানীতে ৪৪৯ জন। পুলিশের ভাষ্য, গ্রেপ্তারদের তালিকাভুক্ত ৮৩ চাঁদাবাজ, তালিকাবহির্ভূত ১৩২, ছিনতাইকারী, ডাকাতিসহ নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ১৬০ ও মাদক কারবারি ৭৪ জন। বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ১৮টি।
তবে এই সাঁড়াশি অভিযানে চিহ্নিত দাগি সন্ত্রাসী এখনও ধরা পড়েনি। অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা কম। পুলিশের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছোট-বড়, নতুন-পুরোনো সব অপরাধীকে ধরতে তারা তৎপর। এ ছাড়া দেশের যেসব এলাকা ধারাবাহিকভাবে খুন, চাঁদাবাজি, মাদক কারবারিদের তৎপরতার কারণে অপরাধপ্রবণ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে তা ঘিরে আলাদা পরিকল্পনা রয়েছে। চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে যেভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েক হাজার সদস্য অভিযান চালিয়ে ছিল, একই আদলে আরও কয়েকটি জেলায় তা চলবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর বেশ কয়েকজন ‘তারকা অপরাধী’ জামিনে কারাগার থেকে বের হয়েছে। ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে নতুন ও পুরোনো সন্ত্রাসীরা তৎপর হয়ে ওঠে। তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে খুনোখুনি ও চাঁদাবাজিতে সম্পৃক্ত হওয়ার অভিযোগ আছে। সর্বশেষ ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে সড়কে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ৭ দিন পার হলেও এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেওয়ার পর ১১ আগস্ট কিলার আব্বাস ও ১৩ আগস্ট কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন সুইডেন আসলাম। তারা দুজনই সরকার কর্তৃক পুরস্কার ঘোষিত ২৩ সন্ত্রাসীর তালিকায় ছিলেন। ১৫ আগস্ট কেরানীগঞ্জের কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন সানজিদুল হাসান ইমন। কিলার আব্বাস ও ইমন মুক্তি পেয়েই দেশ ছেড়েছেন। ২০২৫ সালের ২৭ মে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদকে কুষ্টিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ চক্রের সদস্যদের নতুন তালিকা তৈরির কাজ কিছু দিন আগে শুরু হয়। ঢাকায় ১১শ চাঁদাবাজের নতুন তালিকা তৈরি করা হয়। দেশে শীর্ষ চাঁদাবাজ ৬৫১ জন।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের একটি নোটিশের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ৩০ এপ্রিলের পর দেশে জুয়া, অনলাইন জুয়া ও মাদকের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান শুরু করবে সরকার। এর আগে ঢাকা মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় চাঁদাবাজ ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের নির্মোহ তালিকা তৈরি করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এছাড়া ৯ মার্চ প্রথম সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির বলেন, চাঁদাবাজ ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের একটি তালিকার পাশাপাশি মব সন্ত্রাসে জড়িত ব্যক্তিদেরও তালিকা করা হচ্ছে। চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে।
গত রোববার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের অংশ হিসেবে রাজধানীতে ১ মে থেকে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে।
পাঁচ দিনের অভিযান
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে উঠে আসে, অভিযান শুরুর প্রথম দিন ১ মে সারাদেশে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৪৪ জনকে। তাদের মধ্যে মাদক ও চোরাকারবারি ২৫৪, ছিনতাই ও ডাকাত দলের সদস্য ৯১, চাঁদাবাজ ১১, অবৈধ অস্ত্রধারী ৩ জন। সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তার হয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৯৫, ঢাকা রেঞ্জে ৫৭ জন ও রাজধানীতে ৪৫।
অভিযানের দ্বিতীয় দিন গ্রেপ্তার করা হয় ২৪৪ জনকে। আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয় ৮টি, তার মধ্যে পিস্তল ১টি ও শুটার গান ৭টি। তৃতীয় দিন রোববার সারাদেশে গ্রেপ্তার করা হয় ১ হাজার ৪৮০ জনকে। তাদের মধ্যে বিশেষ অভিযানে ৫৭০ ও বাকি ৯১০ জন মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত। ওই দিন পিস্তল উদ্ধার ১টি, গুলি ৪ রাউন্ড, ম্যাগাজিন ১ ও দেশীয় অস্ত্র ১২টি। ইয়াবা উদ্ধার ৬৪ হাজার ৭৯৭ পিস, হেরোইন প্রায় ১৪ কেজি। মাদকসংক্রান্ত ঘটনায় গ্রেপ্তার ৩৩৭।
সোমবার অভিযানে গ্রেপ্তার ৭৬২ জন, পিস্তল ১টি, শুটারগান ২টি এবং গুলি ১৪ রাউন্ড। গতকাল সারাদেশে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ৯৭৪ জনকে। তাদের মধ্যে বিশেষ অভিযানে ৭০২ জন এবং মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত এক হাজার ২৭২ জন। মাদকসংক্রান্ত ঘটনায় গ্রেপ্তার ৪৭৬ জন। আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ৫টি। তার মধ্যে পিস্তল ২টি, এলজি ২টি ও শুটারগান ১টি। ইয়াবা উদ্ধার এক লাখ ৯৮ হাজার ২৬৩ পিস এবং হেরোইন ২ দশমিক ৪ কেজি। মাদকের সম্পৃক্ততার অভিযোগে গ্রেপ্তার ৩৭৩ জন।
পাঁচ ভাগে তালিকা
ঢাকা মহানগর পুলিশের কয়েক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ভুক্তভোগীর বর্ণনা, গোয়েন্দা তথ্য, সোর্স, প্রযুক্তির সহায়তায় ঢাকায় চাঁদাবাজসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধীদের তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। এবার ঢাকায় বিশেষ করে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে জোর দেওয়া হচ্ছে। চাঁদাবাজদের তথ্য চেয়ে মাসখানেক আগে ডিএমপির সব থানা ও অপরাধ বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রতিটি এলাকায় চাঁদাবাজদের পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করে তালিকা করার কথা বলা হয়। পরিবহন, ফুটপাত, এলাকাভিত্তিক বাজার, অস্ত্রধারী চাঁদাবাজ এবং অটোরিকশা-রিকশা-টেম্পোস্ট্যান্ডে কারা চাঁদাবাজি করে, সেই তথ্য আলাদা করে চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চাঁদাবাজির স্থান, চাঁদার পরিমাণের তথ্যও এই তালিকায় সংযুক্ত করার নির্দেশনা ছিল। এরই মধ্যে সব থানা চাঁদাবাজসহ অপরাধীদের নতুন তালিকা তৈরি করেছে।
পুলিশের লালবাগ বিভাগের ডিসি তালেবুর রহমান সমকালকে বলেন, লালবাগ বিভাগের কোতোয়ালি, বংশাল, কামরাঙ্গীরচর, চকবাজার, সূত্রাপুর ও লালবাগ থানা এলাকায় ৭৫ জন চিহ্নিত চাঁদাবাজ রয়েছে। তাদের মধ্যে অভিযানে ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের ধরতে অভিযান চলছে। এছাড়া এসব চাঁদাবাজকে যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় তাদের বিরুদ্ধেও অভিযান চলবে।
ছায়া সহযোগীরা কবে ধরা পড়বে
বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এক সময় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ভাগ করে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা নিয়ন্ত্রণ করত। অস্ত্রশস্ত্রসহ তাদের ছোট ছোট কিলার গ্রুপও থাকত। কেউ বিদেশে বসে, আবার কেউ কারাগারে থেকে এলাকাভিত্তিক চাঁদাবাজি, গরুর হাটের ইজারা, দরপত্রসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করত। এর পাশাপাশি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং সদস্যদের পৃথক গ্রুপ আছে। তারকা সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং সদস্যদের পেছনে ‘বড় ভাই’ বা গডফাদার থাকে। তাদের কারও কারও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পুরোনো। এলাকাভিত্তিক এসব চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী চক্রের প্রভাবশালী ছায়া সহযোগীদের গ্রেপ্তার করা না গেলে বিশেষ অভিযানের আশানুরূপ ফল আসবে না অনেকের মনে করেন।
পুলিশ সদরদপ্তরের মুখপাত্র এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, মাদক, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি– এই তিনটি অপরাধকে মাথায় রেখে অভিযান কার্যক্রম চলমান। এগুলো সমাজের স্থিতিশীলতা ও মানুষের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত চেকপোস্ট, বিশেষ অভিযান এবং সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।




