লোকসানে ৫৪টি কোম্পানি, মুনাফা কমেছে ৫৭টির

0
5

রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি যুদ্ধসহ নানা বৈশ্বিক কারণে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি কয়েক বছর ধরে চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছে। তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে উৎপাদন ও সেবা-সংশ্লিষ্ট খাতের কোম্পানির লাভ-ক্ষতির খতিয়ানে।

চলতি ২০২৫-২৬ হিসাব বছরের প্রথম ৯ মাসে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত উৎপাদন ও সেবা-সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর অন্তত তিন-চতুর্থাংশ বা ৭৫ শতাংশ হয় লোকসান করেছে, নয়তো মুনাফা কমেছে, অথবা বন্ধ ও রুগ্‌ণ অবস্থায় পড়ে আছে বলে আর্থিক হিসাব প্রকাশই বন্ধ রেখেছে।

প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদন ও সেবা-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের তালিকাভুক্ত দেশীয় কোম্পানি ২৩১টি। এসব কোম্পানির আর্থিক হিসাব বছর জুলাই মাসের শুরু হয়ে শেষ হয় জুনে। গত ৩১ মার্চ সমাপ্ত তৃতীয় প্রান্তিক শেষে এ ধরনের কোম্পানিগুলোর প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১১৩ কোম্পানি কম-বেশি মুনাফা করার বিপরীতে ৫৪টি লোকসান করেছে বলে জানিয়েছে। তবে মুনাফায় থাকা ১১৩ কোম্পানির মধ্যে ৫৭টির মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে।

এর বাইরে ৬৪ কোম্পানি আর্থিক প্রতিবেদনই প্রকাশ করেনি। আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করা কোম্পানিগুলোর অধিকাংশ গত অন্তত এক বছর থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করছে না। এর বড় কারণ কোম্পানিগুলোর ব্যবসা কার্যক্রম হয় পুরোপুরি বন্ধ বা অত্যন্ত রুগ্‌ণ অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। এসব কোম্পানির বেশির ভাগই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হয়েছিল।

আর্থিক প্রতিবেদন এবং কোম্পানিগুলোর প্রদান করা তথ্যানুযায়ী, চলতি হিসাব বছরে লোকসান করার পেছনে প্রধানত বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, ডলার সংকট, ঋণের উচ্চ সুদহার এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির মতো কারণগুলো উৎপাদনমুখী কোম্পানির ব্যাখ্যায় লোকসানের মূল নেপথ্য কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

বেশ কিছু কোম্পানি জানিয়েছে, ডলার সংকটের কারণে তারা সময়মতো কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খুলতে পারেনি। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাজার থেকে বেশি দামে কাঁচামাল কিনতে হয়েছে। দেশবন্ধু পলিমার জানিয়েছে, কাঁচামালের অভাবের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটে পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেনি।

মেঘনা সিমেন্ট কোম্পানিও জানিয়েছে, কাঁচামাল আমদানিতে বাধার কারণে কোম্পানিটি তার পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারেনি এবং আয়ের জন্য প্রধানত কনভার্সন ইনকামের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য বাড়ার ফলে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে মিরাকল ইন্ডাস্ট্রিজ।

হেইডেলবার্গ সিমেন্ট জানিয়েছে, কাঁচামালের দাম বাড়লেও বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে পণ্যের দাম বাড়াতে না পারায় মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গ্লোবাল হেভি কেমিক্যালস এর ব্যাখ্যায় বলেছে, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং গ্যাস-বিদ্যুৎসহ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া লোকসানের বড় কারণ। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় কোম্পানিগুলোর আর্থিক ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে, যা নিট মুনাফাকে নেতিবাচক করে তুলেছে। এমন ব্যাখ্যা দিয়েছে এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন এবং বসুন্ধরা পেপার মিলসও।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিক্রি কমেছে বলে জানিয়েছে সিঙ্গার বাংলাদেশ। মুন্নু সিরামিকস জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ঈদ ও নির্বাচনের ছুটির কারণে কর্মদিবস কমে যাওয়ায় তাদের রাজস্ব ও মুনাফা কমেছে। এদিকে কারখানা বন্ধ থাকা কয়েকটি কোম্পানি আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে মিথুন নিটিং বলেছে, কারখানা বন্ধ থাকায় কোম্পানিটির কোনো আয় হয়নি।

ভালো করেছে কিছু কোম্পানি

সার্বিক এমন নেতিবাচক চিত্রের বিপরীতে কিছু কোম্পানি ভালো মুনাফা করারও তথ্য দিয়েছে। প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিসাব বছরের প্রথম ৯ মাসে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে অন্তত ৩০ কোম্পানির ইপিএস অর্জিত হয়েছে পাঁচ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৪৪ টাকা।

বারাকা পাওয়ার কোম্পানিটির ৯ মাসের ইপিএস ২৯ পয়সা থেকে বেড়ে ৮৭ পয়সা হয়েছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এই মুনাফা বেড়েছে। সহযোগী কোম্পানি তালিকাভুক্ত বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার কোম্পানিটির ইপিএস ৭৪ পয়সা থেকে বেড়ে দুই টাকা ৮৬ পয়সা হয়েছে। কারণ হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়জনিত লোকসান কমা এবং গত বছরের তুলনায় আর্থিক ব্যয় কমে যাওয়াকে উল্লেখ করেছে।

জ্বালানি খাতের কোম্পানি সিভিও পেট্রোকেমিক্যালের ইপিএস দুই টাকা ৩৫ পয়সা থেকে বেড়ে পাঁচ টাকা ০৮ পয়সা হয়েছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, বিক্রি বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের দাম কমে যাওয়ায় তাদের মুনাফা বেড়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিদ্যুৎ সঞ্চালনকারী জাতীয় প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি গত বছরের লোকসান কাটিয়ে ৯ মাসে বড় মুনাফা করেছে। তাদের ৯ মাসের ইপিএস ৩৪ পয়সা থেকে ছয় টাকা ২৪ পয়সায় উন্নীত হয়েছে।

প্রকৌশল খাতের আনোয়ার গ্যালভানাইজিং লোকসান কাটিয়ে ৯ মাসে শেয়ারপ্রতি চার টাকা ইপিএস দেখিয়েছে। তারা জানিয়েছে, তাদের ‘নন-অপারেটিং’ আয় অনেক বেশি হওয়ায় মুনাফায় এই পরিবর্তন এসেছে।

কোম্পানিগুলোর নিট মুনাফার অঙ্কের দিকে তাকালে দেখা যায়, স্কয়ার ফার্মা সর্বোচ্চ দুই হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে। স্টিল খাতের বিএসআরএম লিমিটেড এবং বিএসআরএম স্টিল যথাক্রমে ৪৬৪ কোটি ও ৪৩২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। বিদ্যুৎ খাতের পাওয়ার গ্রিড ৫৭০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।

আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশে ব্যর্থ যারা

নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও অনেক কোম্পানি তাদের তৃতীয় প্রান্তিকের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেনি। এই তালিকায় রয়েছে জিপিএইচ ইস্পাতের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ছাড়া টেক্সটাইল খাতের আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ, ফ্যামিলি টেক্স, জেনারেশন নেক্সট এবং ওষুধ খাতের বেক্সিমকো ফার্মা, কেয়া কসমেটিকস ও মারিকো বাংলাদেশ তাদের আর্থিক তথ্য এখনও প্রকাশ করেনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here