কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া নদী ভাঙনে দিশেহারা দুই জেলার মানুষ, বিলীন হচ্ছে জনপদ ও ফসলি জমি

0
2

নদী ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার নদীপাড়ের মানুষ। মেঘনা, ধলেশ্বরী ও লঙ্গন নদীর পানি বৃদ্ধি ও প্রবল স্রোতের কারণে দুই জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে নতুন মানচিত্র পরিবর্তনের শঙ্কাও দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।

স্থানীয়রা জানান, উজানের ঢল, টানা বৃষ্টি, নদীতে চর জেগে ওঠা এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। এতে এক সময়ের জনবহুল এলাকা ও শত বছরের পুরোনো জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে।

নাসিরনগরের গোয়ালনগর ও ভলাকুট ইউনিয়নের মেঘনা নদীতে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ চর জেগে উঠেছে। অন্যদিকে অষ্টগ্রামের নোয়াগাঁও এলাকায় একটি ইটভাটার প্রভাবে দীর্ঘদিন ধরে চর পড়তে শুরু করে, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

২০১৪ সালে নদী ভরাট করে রাস্তা নির্মাণের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা। বর্তমানে মেঘনার মূল স্রোত লোকালয়ের দিকে ধাবিত হয়ে ভাঙন তীব্র করছে।

ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

ভাঙনের কারণে ইতোমধ্যে নোয়াগাঁও এলাকায় নবনির্মিত পাকা সড়কের অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। স্থানীয় বাজার, দোকানপাটসহ প্রায় দুই হাজার বিঘা ফসলি জমি হারিয়ে গেছে বলে জানা গেছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ লাইনের ক্ষতিতে প্রায় চার হাজার গ্রাহক সংযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী রহমত খান বলেন, “যেভাবে ভাঙন চলছে, কয়েক দিনের মধ্যে পুরো নোয়াগাঁও গ্রাম মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে।”

প্রশাসনের উদ্যোগ ও মতভেদ

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সেলিম মিয়া জানান, উজানের ঢল ও নদীর তলদেশের মাটি সরে যাওয়ায় দ্রুত ভাঙন দেখা দিয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলছে।

তবে পরিবেশবিদরা বলছেন ভিন্ন কথা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জের সহসভাপতি তোফাজ্জল সোহেল বলেন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং দীর্ঘদিন ড্রেজিং না হওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দ্রুত স্থায়ী সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

নাসিরনগরের চাতলপাড়ে ভয়াবহ ভাঙন

একই ধরনের ভাঙন দেখা দিয়েছে নাসিরনগরের চাতলপাড় ইউনিয়নেও। চকবাজার, বিলেরপাড় ও অফিসপাড়ায় নদী ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বাজার, ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি মেঘনায় বিলীন হয়ে অনেক পরিবার এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অষ্টগ্রামের একটি ইটভাটার কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে এই ভাঙনের সূত্রপাত হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে ভাঙন শুরু হলেও কার্যকর কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও তারা অভিযোগ করেন।

চকবাজার এলাকার বাসিন্দা ইমরান আলী বলেন, “প্রতিবারই কিছু জিও ব্যাগ ফেলে আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু স্থায়ী বাঁধের কোনো উদ্যোগ নেই।”

স্থায়ী বাঁধের দাবি

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আকাশ দত্ত জানান, চাতলপাড়সহ আশপাশের ভাঙন রোধে প্রায় দেড় কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধের প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু করা হবে।

জনজীবনে বিপর্যয়

ভাঙনে বিলেরপাড় জামে মসজিদসহ বহু স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে বলে জানান স্থানীয়রা। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে নিঃস্ব হয়ে এলাকা ছেড়েছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য এম এ হান্নান বলেন, হাওরাঞ্চলের তিনটি ইউনিয়নের মানুষের দুর্ভোগ কমাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ চলমান রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না করা হলে দুই জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়বে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here