সিলেট লোকসানের শঙ্কা, চামড়া কেনা নিয়ে দোটানায় ব্যবসায়ীরা কওমি মাদ্রাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ করবে না

0
5

কোরবানির পশুর চামড়া কওমি মাদ্রাসারগুলো সংগ্রহ না করার ঘোষণা, ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া আদায় না হওয়া এবং চামড়ার দাম ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় সিলেটের ব্যবসায়ীরা এবার চামড়া কিনবেন কিনা– দোনামোনায় আছেন। এ ব্যাপারে শিগগির বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেবেন তারা।

সিলেটের শাহজালাল বহুমুখী চামড়া ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির ব্যবসায়ীরা গত বছর দুই কোটি ১০ লাখ টাকার চামড়া বিক্রি করেন।
সমিতির আওতাধীন ৫৫-৬০ ব্যবসায়ী আছেন। এ ছাড়া খুচরা ব্যবসায়ী রয়েছেন শখানেক। এর বাইরে রয়েছেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা।
এই সমিতির আওতাধীন ব্যবসায়ীরা অতীতে প্রতিবছর ৭০ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার চামড়া সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ৭০ ভাগ চামড়া সংগ্রহ করেন কওমি মাদ্রাসা থেকে। মাদ্রাসার কয়েক হাজার শিক্ষার্থী বাড়ি বাড়ি গিয়ে লিল্লাহ বোর্ডিং ও এতিমখানার নামে চামড়া সংগ্রহ করতেন।

কিন্তু গত সোমবার সংবাদ সম্মেলন করে এবার চামড়া সংগ্রহ না করার ঘোষণা দেন সিলেট বিভাগ কওমি মাদ্রাসা সংরক্ষণ পরিষদের সদস্য সচিব মাওলানা মুশতাক আহমদ খান। তিনি বিগত দুই সরকারের ‘ষড়যন্ত্র ও অকার্যকর সিদ্ধান্ত’ এবং বর্তমান সরকারের উদাসীনতার অভিযোগ তোলেন। পরের দিন সুনামগঞ্জের মাদ্রাসাগুলোও একই ঘোষণা দেয়।
বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ড. আবু জাফর মো. ফেরদৌস জানিয়েছেন, গত বছর সিলেট বিভাগে তিন লাখের বেশি এবং সিলেট জেলায় প্রায় দেড় লাখ পশু কোরবানি দেওয়া হয়। এবার কোরবানির পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৭২ হাজার ১৭৪টি।

কওমি মাদ্রাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ না করার ঘোষণা দেওয়ায়, এবার এত বিপুলসংখ্যক পশুর চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে কারা সরবরাহ করবেন– এই প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছে।
এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির কিছুটা সময় চেয়েছেন। তিনি গত শুক্রবার সিলেটের এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, চামড়া খাতের দুর্বলতা চিহ্নিত করে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। এ খাতকে শক্তিশালী করতে কাজ চলছে।

তবে এতে আস্থা রাখতে পারছেন না সিলেটের চামড়া ব্যবসায়ীরা। মাদ্রাসাগুলোর ঘোষণা ও সিন্ডিকেটের কারণে এবার চামড়া ব্যবসায় লোকসান গোনার আশঙ্কার প্রসঙ্গ টেনে শাহজালাল চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান মিয়া বলেছেন, ‘লোক দেখানো উদ্যোগে ভরসা পাচ্ছি না। সরকার বদলায় কিন্তু চামড়ার সিন্ডেকেট বদলায় না।’ তিনি মনে করেন, কওমি মাদ্রাসারগুলোর চামড়া সংগ্রহ না করার ঘোষণা, ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া টাকা না পাওয়া এবং বাজারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ দাম নির্ধারণ করার প্রেক্ষাপটে সিলেটের চামড়া ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কম। এমনিতেই এই শিল্প ধুঁকছে। এখন সিংহভাগ জোগানদাতা মাদ্রাসাগুলোর ঘোষণা, ব্যবসায়ীদের লোকসানের মুখে ফেলছে।

শাহজালাল বহুমুখী চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি শেখ শামিম আহমদ জানিয়েছেন, শুধু সিলেট নয়, সারাদেশের ব্যবসায়ীরা ট্যানারি মালিকদের কাছে টাকা পাবেন। তাদের ট্যানারি মালিকদের কাছে সমিতির ৬০  ব্যবসায়ীর তিন কোটি টাকার বেশি বকেয়া পাওনা রয়েছে। অনেক দেনদরদার করে কয়েক বছরে সামান্য করে টাকা পেয়েছেন অনেকে। চামড়া সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতসহ সব খরচ মিলিয়ে যখন লাভের মুখ দেখেন না, তখন কেউ দেউলিয়া হন, কেউবা ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। একসময় এই সমিতির আওতাধীন অন্তত ৩০০ ব্যবসায়ী ছিলেন এবং খুচরা ব্যবসায় ছিলেন হাজারখানেক। ইতোমধ্যে ব্যবসা পরিবর্তন করেছেন ৮০ ভাগ।

সমিতির সাবেক আহ্বায়ক মো. শাহজাহান বলেন, এই সমিতির ব্যবসায়ীরা অন্তত ৭০ হাজার চামড়া ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করেন। গড়ে ৪০০ টাকা করে মোট ২ কোটি ১০ লাখ টাকার চামড়া বিক্রি হয়। তবে এবার পরিস্থি অন্য রকম আভাস দিয়ে তিনি বলেন, ‘এবার চামড়া সংগ্রহ এবং ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে পাওনা আদায়সহ নানা বিষয়ে শিগগির আমরা বৈঠকে বসব। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে সমিতির ব্যবসায়ীরা চামড়া সংগ্রহ করবেন কিনা।’

এদিকে ভারতে চামড়া পাচারের আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে চামড়া পাচার রোধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্ত এলাকায় টহল বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট হিসেবে বিছনাকান্দি, উৎমা, সোনারহাট, কালাইরাগ ও সুতারকান্দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দেবে বলে জানিয়েছে বিজিবি।
জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ‘চামড়া ব্যবসায়ী ও কওমি মাদ্রাসাগুলোর সঙ্গে দুয়েক দিনের মধ্যে আমরা বসব। সরকারের পক্ষ থেকে এবার লবণসহ বিভিন্ন সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। আমরা চাই ব্যবসায়ীরা যেন ভালো মূল্যে তা বিক্রি করতে পারেন। সেজন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here