চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) কৃষি খাতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি হলেও উৎপাদন বা শিল্প খাতে স্থবিরতা বজায় ছিল। তবে সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল মধ্যম পর্যায়ের। সার্বিকভাবে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা শেষে আলোচ্য প্রান্তিকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ার ধাপে প্রবেশের আভাস মিলেছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) অর্থনৈতিক সূচক ‘ইকোনমিক পজিশন ইনডেক্স’ (ইপিআই) থেকে এমন তথ্য দিয়েছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই কার্যালয়ে এ সূচক প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি তাসকিন আহমেদ।
ঢাকা জেলার ৭৬২টি প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে ঢাকা চেম্বার বলেছে, ইপিআই সূচকে কৃষি খাত পেয়েছে শূন্য দশমিক ৮০, উৎপাদন খাত শূন্য দশমিক ৩৩ এবং সেবা খাত শূন্য দশমিক ৪৭। সার্বিক ইপিআই মান দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ৫০, যা ‘মডারেট’ বা মধ্যম মান নির্দেশ করে। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে কোনো প্রতিষ্ঠান ভালো করলে তার মান ‘এক’ এবং স্থিতিশীল বা খারাপ করলে ‘শূন্য’ ধরে সূচকটি গণনা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বা ব্যবসায় কতটা ভালো বা খারাপ করেছে, তা এ সূচকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
ডিসিসিআই বলেছে, আলোচ্য সময়ে বেসরকারি খাতে আশানুরূপ বিনিয়োগ না হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। সেবা খাতের অবস্থা ‘মডারেট’ বা মধ্যম পর্যায়ে রয়েছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং তারল্য সংকটের কারণে বেসরকারি খাতের প্রকৃত স্বাস্থ্য এখনও পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি।
বেসরকারি খাতের প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে ঢাকা চেম্বার ঢাকাকেন্দ্রিক ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা নিয়ে একটি ত্রৈমাসিক নতুন সূচক ইপিআই চালু করেছে। তবে আলোচনায় অংশ নিয়ে কয়েকজন অর্থনীতিবিদ এ উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি আরও বৃহত্তর অঞ্চলের অর্থনৈতিক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ‘রিয়েল-টাইম’ বা তাৎক্ষণিক তথ্যের ভিত্তিতে সূচক গণনার ওপর জোর দেন।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, এ সূচক একটি উচ্চমাত্রার ডেটা প্রাক্কলন, যা অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বুঝতে সহায়ক। তিনি উল্লেখ করেন, সূচকটি বর্তমানে কিছুটা ‘ঢাকাকেন্দ্রিক’ মনে হচ্ছে, তবুও সামগ্রিক ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের জন্য একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
আইএফসির সিনিয়র প্রাইভেট সেক্টর স্পেশালিস্ট মিয়া রহমত আলী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ভোক্তানির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে ঝুঁকছে, কিন্তু উৎপাদনশীল খাতের স্থবিরতা কাটানো জরুরি। তিনি এসএমই খাতের অর্থায়নের চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন এবং তৈরি পোশাক খাতকে পরিবেশবান্ধব ও কমপ্লায়েন্ট করার জন্য সরকারি সহায়তার ওপর জোর দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক গতি ছিল। ২০২২ সালের পর থেকে এতে বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটে। ২০২২ সালে দেশের চলতি হিসাবের বিশাল ঘাটতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে তিন-চার বছর ধরে অর্থনীতি বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে আমরা একটি জটিল অর্থনৈতিক সময় পার করছি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ নেসার আহমেদ বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এসএমই খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, জিডিপি পরিসংখ্যান আসতে দেরি হওয়ার কারণে অনেক সময় সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় নীতি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তিনি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের বিগ ডেটা ব্যবহার করে জিডিপির ত্রৈমাসিক প্রক্ষেপণ করার পরামর্শ দেন।




