মহিষের বাথানিয়া (রাখাল) মো. মাকসুদের বাড়ি নেয়ামতপুর চরে। মধ্য মেঘনার চরটি পড়েছে ভোলার দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নে। বছর দুয়েক আগে জোয়ারে ভেসে যায় তাঁর ১০টি মহিষ। তিন দিন পর ৮টি ফিরে পেলেও বাকি দুটি আর পাননি। মাকসুদের ভাষ্য, বর্ষা, ঝড়-বাদলে আশ্রয় নেওয়ার মতো চরবাসীর জন্য নিরাপদ কোনো কেল্লা (শেল্টার) নেই। ফলে প্রতিবছরই জোয়ারের স্রোতে চরের অনেক বাথানিয়ার মহিষ ভেসে যায়।
চলতি বছরের দুর্যোগ মৌসুমের শুরুতেই নিরাপত্তা নিয়ে ভুগছেন উপকূলীয় জেলা ভোলার চরাঞ্চলের লাখো বাসিন্দা। এর মধ্যে বেশি ঝুঁকিতে আছেন মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যবর্তী ২১টি চরে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষ। এসবের ৯টিতেই কোনো সাইক্লোন শেল্টার নেই। ১২টি চরে দু-একটি করে আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। সব মিলিয়ে দুর্যোগকালে জেলার ২০ লাখ মানুষের আশ্রয়ের জন্য ৯১৫টি ‘স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার’ আছে। এতে সব মিলিয়ে পাঁচ লাখের মতো মানুষ আশ্রয় নিতে পারেন। যা জেলার মোট জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগ, বাকি তিন ভাগ মানুষকে অরক্ষিত অবস্থায় কাটাতে হবে। চলতি মৌসুমের ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বড় ক্ষতির আগেই অরক্ষিত এসব মানুষের আশ্রয় নিয়ে সরকাবি ব্যবস্থাপনার দাবি উঠেছে।
গত শুক্রবার সরেজমিন দেখা গেছে, চরগুলোর চারপাশের মেঘনার অথই পানি। এর মধ্যে ছোট ছোট কাঁচা ঘর আর সরকারি আশ্রয়ণে বসবাস করছেন মানুষ। যাতায়াতের কোনো রাস্তা নেই। ভরা বর্ষায়ও ছোট নৌকা দিয়েই যাতায়াত করতে হয়। শুকনো মৌসুমে খোলা মাঠ আর নালা-ডোবা হেঁটেই পাড়ি দিতে হয়।
নদীভাঙনে সব হারিয়ে বেশ কিছু মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন মদনপুর ইউনিয়নের চর মুন্সীতে। মেঘনার এই চরে বর্তমানে বাস করেন সাড়ে চার হাজার মানুষ। কৃষিনির্ভর এই চরে রয়েছে কয়েক হাজার গরু-মহিষ। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো সাইক্লোন শেল্টার নেই এখানে। এই চরের কিষানি মরিয়ম বিবি বলেন, একটানা কয়েক দিন ঝড়বৃষ্টি থাকলে তাদের ঘরেই বন্দি থাকতে হয়। বের হওয়ার উপায় থাকে না। ‘আল্লাহর ওপর ভরসা’ করেই তাদের মোকাবিলা করতে হয় বৈরী আবহাওয়া।
ব্যবসায়ী মিলন পাটোয়ারীর ভাষ্য, বর্ষার দুর্যোগে মেঘনার পানি স্বাভাবিকের চেয়ে সাত-আট ফুট উঁচু দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ সময় পুরো চর প্লাবিত হয়ে ঘরবাড়ি তলিয়ে যায়। তখন গবাদি পশু নিয়ে তাদের পড়তে হয় বিপাকে। স্রোতের তীব্রতা বাড়লে ঘরবাড়ি, গরু-ছাগলও ভেসে যায়। এই চরে জীবনধারণ পুরোপুরি অনিরাপদ উল্লেখ করে মিলন আরও বলেন, নদীভাঙনের শিকার দরিদ্র পরিবারের লোকজনই এখানে বসবাস করেন। তাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। দুর্যোগের সময় তাদের আশ্রয়েরও কোনো ব্যবস্থা নেই।
একই ইউনিয়নের চরপদ্মার কিষানি মর্জিনা বেগমের দুটি গরু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের জলোচ্ছ্বাসে মেঘনায় ভেসে গেছে। এতে দরিদ্র এই নারীর ক্ষতি হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকার। একই সময়ে একটি করে গরু হারিয়েছেন চরপদ্মার রফিক মাঝি, পারভেজ ও কবির।
স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, জেলার চরফ্যাসনের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত ঢালচর, পূর্ব ঢালচর, তজুমদ্দিন উপজেলার মেঘনার মধ্যবর্তী চর লাদেন, চর লক্ষ্মী, দৌলতখান উপজেলার চর হাজিপুর, মনপুরা উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের চর সামসুদ্দিন, কলাতলী ইউনিয়নের কাজিরচর, সদর উপজেলার চর সুলতানি; তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যবর্তী লালমোহন উপজেলার মোতাহারনগরের চর কচুয়াখালীতে কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নেই। অথচ এসব চরে বসবাস করেন অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় খড়কুটো দিয়ে তৈরি নাজুক কাঁচা ঘরেই ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে হয়।
একইভাবে আশ্রয়কেন্দ্রের সংকট আছে মূল ভূখণ্ডের নদী তীরবর্তী এলাকায়ও। জানা গেছে, মূল ভূখণ্ড থেকে বিছিন্ন দুর্গম চর নিজামের তিন হাজার মানুষের জন্য একটি, কলতলীর চরের ২০ হাজার মানুষের জন্য দুটি, চর মোজাম্মেলের সাত হাজার মানুষের জন্য একটি, মেদুয়ার পাঁচ হাজার মানুষের জন্য দুটি, মদনপুরের ১০ হাজার মানুষের জন্য দুটি স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার আছে।
ঢালচরের বাসিন্দা রফিক ফরাজী বলেন, দুর্যোগ শুরু হলে গবাদি পশু রেখে অনেকে অন্য জায়গায় যেতে চান না। দুর্যোগের সংকেত ৮ থেকে ১০ হলে প্রশাসনের পক্ষে এসব মানুষকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয় না। তখন নদীতে কোনো নৌযান চলাচল করতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া বা ঘরে বসে প্রাণ দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না বিপুল সংখ্যক মানুষের।
ঢালচর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান আবদুস সালাম হাওলাদার বলেন, প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়েই বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ও গবাদি পশুর ক্ষতি হয়। জোয়ারে গুরুত্বপূর্ণ মালপত্র ও ক্ষেতের ফসল ভেসে যায়।
ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের তথ্যমতে, জেলার সাত উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা ৯১৫টি। সদর উপজেলার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের জন্য ১৩৭টি, দৌলতখানের এক লাখ ৭২ হাজার মানুষের জন্য ১১২টি, বোরহানউদ্দিনের দুই লাখ ৬৫ হাজার বাসিন্দার জন্য ১২২টি, তজুমদ্দিন উপজেলার প্রায় দেড় লাখ মানুষের জন্য ৭৬টি, লালমোহন উপজেলার দুই লাখ ৮৩ হাজার মানুষের জন্য ১৯৮টি, চরফ্যাসনের চার লাখ ৫৬ হাজার বাসিন্দার জন্য ১৬৫টি ও মনপুরার লক্ষাধিক মানুষের ৫৯টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া নতুন করা হয়েছে ভোলা সদরে ৯টি, দৌলতখানে ছয়টি, বোরহানউদ্দিনে ছয়টি, তজুমদ্দিনে আটটি, চরফ্যাসনে ১১টি ও মনপুরায় ছয়টি কেন্দ্র।
এর মধ্যে শতাধিক কেন্দ্রে সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। চরফ্যাসনের চর কুকরি-মুকরি ইউনিয়নের চরপাতিলার প্রায় দুই হাজার বাসিন্দার জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র। তিন দশক আগে নির্মিত কেন্দ্রটি ব্যবহারের অনুপযোগী বলে জানান সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কাশেম ও বাদশা মিয়া। তারা জানিয়েছেন, আশ্রয়কেন্দ্রের ছাদের পলেস্তারা খসে খসে পড়ছে। ভবনে আশ্রয় নেওয়ার মতো অবস্থা নেই।
মদনপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, তাঁর ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র দুটি আশ্রয়কেন্দ্র আছে। মেঘনায় মাছ ধরা আর গবাদি পশু পালন করেই চলে তাদের জীবিকা। চরমুন্সীর সাড়ে চার হাজার মানুষের জন্য একটিও নেই। যুগ যুগ ধরে চরের এসব বাসিন্দারা অরক্ষিত। তাদের নিরাপত্তা বলয়ে আনা জরুরি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সৈয়দ মো. আজিম উদ্দিন গতকাল রোববার সমকালকে বলেন, যেসব চরে আশ্রয়কেন্দ্র নেই, সেখানে আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপনে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে সাতটি চরে মাটি কেটে উঁচু করাসহ একতলা অবকাঠামো নির্মাণের প্রকল্প চলছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্যোগের সময় পশুর পাশাপাশি মানুষও আশ্রয় নিতে পারবেন।
জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমানের ভাষ্য, যেসব চরে আশ্রয়কেন্দ্র নেই, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কেন্দ্রে নির্মাণ করা হবে। এ বিষয় তিনি সম্প্রতি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন। দুর্যোগে সবাইকে আশ্রয়ের আওতায় আনার লক্ষ্যে কাজ চলছে। যেসব আশ্রয়কেন্দ্র জরাজীর্ণ, সেগুলো ব্যবহার উপযোগী করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।




