বাংলাদেশের রাজনীতি এখন কার্যত একটি জোটের নিয়ন্ত্রণে। জোটটির একাংশ সরকার চালাচ্ছে, বাকি অংশ বিরোধী দলের ভূমিকায়। সংসদে কিংবা সংসদের বাইরে নানা রাজনৈতিক প্রশ্নে মতভেদ প্রকাশ পাচ্ছে বটে, তবে এগুলো কোনোটাই চূড়ান্ত বিচারে কোনো পক্ষের জন্য ‘রাজনৈতিক হুমকি’ নয়। সংবিধান সংস্কার ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু উত্তপ্ত কথাবার্তা হচ্ছে বটে; অনুমান করা যায়, কিছুদিনের মধ্যে এরও সমাধান হয়ে যাবে। যখন বিএনপি সংবিধান সংস্কার প্রশ্নে ‘কার্ডগুলো’ ওপেন করতে শুরু করবে।
এটিও বোধগম্য, এই সময়ের মধ্যে বিএনপি সংগঠন গুছিয়ে নেবে; সরকারের আশপাশে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তৈরি করবে; সরকারি সুযোগ-সুবিধার ভেতর দিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ‘প্যাট্রন ক্লায়েন্ট’ সম্পর্ক তৈরি এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিজস্ব ‘ভোটব্যাংক’ শক্তিশালী করবে। এরপরই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সম্পন্ন করে দেশব্যাপী দলের শক্তিশালী ভিত রচনা করবে।
অস্বীকারের উপায় নেই, বিএনপি-জামায়াতের ঐক্যের ভিত্তি নতুন মাত্রা পেয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে। ‘জুলাই সনদ’ এই ঐক্যের পোশাকি দিক। অ-পোশাকি দিকটা বরং বেশি শক্তিশালী; আওয়ামী লীগ যাতে কোনোভাবে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে। এটিও সত্য, বিরাট জনসমর্থন থাকা রাজনৈতিক দলকে দীর্ঘদিন রাজনীতিতে ‘ব্রাত্য’ রাখা যায় না। আওয়ামী লীগ নিয়ে সদ্য গঠিত এনসিপির ক্রোধ যত বেশিই হোক, বিএনপি-জামায়াত এটি বোঝে যে, আওয়ামী লীগকে এক সময়ে রাজনীতিতে জায়গা করে দিতেই হবে। দল দুটি আশা করে, সেই আওয়ামী লীগ হবে পুনর্গঠিত। গণঅভ্যুত্থান-পূর্ব আওয়ামী লীগ নয়; তারা এমন আওয়ামী লীগ চায়; যার ভেতরে ‘বোধোদয়’ ঘটেছে। প্রতিশোধস্পৃহাসম্পন্ন আওয়ামী লীগকে জায়গা দিতে নারাজ বিএনপি-জামায়াত।
এটিও মনে রাখা দরকার, আওয়ামী লীগ এখন বিএনপি-জামায়াতের কাছে ‘চরম অবিশ্বস্ত’ দল। ২০১৪ সাল থেকে পরবর্তী ১০ বছর ধরে দল দুটির ওপর যে মাত্রার নিপীড়ন চলেছে; সেটি বাংলাদেশের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফলে আওয়ামী লীগ যদি বোধোদয় নিয়েও রাজনীতিতে ফিরে আসে, তাহলেও বিএনপি-জামায়াত তাদের ‘চোখে চোখে’ রাখবে। কেননা, শক্তি সঞ্চয় করতে পারলেই আওয়ামী লীগ প্রতিশোধপ্রবণ হয়ে উঠতে পারে বলে তাদের ধারণা।
এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সামনে এখনও ঘোর অমানিশা। বিদেশি শাসকগোষ্ঠীর কাছে আশ্রয় পেয়ে হয়তো টিকে থাকা যায়। কিন্তু নিজ দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করা যায় না– এটি তারা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছে বলে মনে হয়। কিন্তু কী কৌশলে তারা রাজনীতিতে প্রবেশ করবে; সেটি এখনও অজানা।
আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি, কেন্দ্রীয় নেতাসহ ক্ষমতাশালীদের বড় অংশই ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। অনেক নেতাকর্মীকে বিরূপ রাজনৈতিক পরিবেশে হিংসাত্মক ঘটনায় জীবন দিতে হয়েছে। দেশে হাজার হাজার নেতাকর্মী এখনও জেলে কিংবা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের অনেকেই এখন ঘর-সংসার, জীবন-জীবিকা হারিয়ে নিঃস্বপ্রায়। স্থানীয় পর্যায়ে যেখানে যতটুকু সম্ভব জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করে টিকে আছে। গ্রাম-গঞ্জে-হাট-বাজারে এক সময় যেসব আওয়ামী নেতা-পাতি নেতার দাপটে বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা মাথা নিচু করে হাঁটতে বাধ্য হতেন, সেই নেতারা এখন জামায়াত-বিএনপির নেতা-পাতিনেতাদের সামনে মাথা নিচু করে নীরবে হেঁটে যান!
ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে শেখ হাসিনা চিরাচরিত কায়দায় ‘হুমকি-ধমকি’ দিয়েছেন। কর্মীদের মনোবল ঠিক রাখার জন্য প্রথম কয়েক মাস হয়তো এটি দরকার ছিল। কিন্তু তিনি দলটিকে গোপনে গুছিয়েছেন কিংবা সে প্রচেষ্টা নিচ্ছেন– এমন কোনো আলামত এখনও দেখা যায়নি। বিদেশের মাটিতে বসে কিছু আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী সামাজিক মাধ্যমকে গরম রাখছেন বটে; দেশের মাটিতে বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। বিচ্ছিন্নভাবে এখানে সেখানে আওয়ামী কর্মীরা ভয়ানক রিস্ক নিয়ে ঝটিকা মিছিল করে গোপনে মিলিয়ে যাচ্ছে; ঠিক যেমন আওয়ামী শাসনামলে জামায়াতে ইসলামী ঝটিকা মিছিল করত।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পরও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক জীবনে দুর্দিন নেমে এসেছিল; তবে সেটি আজকের মতো ঘোর দুর্দিন ছিল না। আওয়ামী এমপি-মন্ত্রীরা মোশতাকের মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিয়েছিলেন; নেতাকর্মী-বুদ্ধিজীবীরা কেউ পালিয়ে যাননি। সুতরাং সেই বৈরী পরিবেশেও দেশে থেকে দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করতে খুব বেগ পেতে হয়নি। এবারের আওয়ামী লীগের বিপর্যয় একেবারেই অন্যরকম। প্রায় দু’বছর হতে চলল; নেতৃত্বের কোনো দিশা পাওয়া গেল না। জামায়াত কিংবা বামপন্থি-চরমপন্থি দলের মতো আওয়ামী লীগ কোনো ‘ক্যাডারভিত্তিক’ দল নয় যে, তারা বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশে গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম। ফলে আওয়ামী লীগকে যে কোনোভাবেই হোক মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার পথ খুঁজতে হবে।
কিন্তু দলটি সম্ভবত এখনও ঘোরের মধ্যে আছে। মনে করছে, বিএনপি-জামায়াতের দ্বন্দ্ব/মতপার্থক্য যদি মারামারি হানাহানিতে রূপ নেয়; বর্তমান সরকার যদি আওয়ামী শাসনামলের তুলনায় আরও বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হবে এবং ‘টুক’ করে তারা রাজনীতিতে হাজির হবে। এটি খুবই বালখিল্য চিন্তা। অন্যদিকে এমন ধারণাও আছে, ভারত তাদের জন্য কিছু একটা করবে। সেটি এমন হতে পারে, ভারত সরকার নানা দিক দিয়ে চাপ সৃষ্টি করবে। এটিও খুব অপরিপক্ব চিন্তা। কারণ বাংলাদেশের সরকার এগুলো সম্পর্কে জ্ঞাত এবং হ্যান্ডল করার মতো ক্ষমতা রাখে। তা ছাড়া ভারত নিজে ডিল করতে চায় একটা নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে, যেটি তারা এখন পেয়েছে। ভারতের নজর এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের দিকে। কারণ বিগত দু’বছরে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। এর বাইরে আছে আরও নানান আঞ্চলিক ইস্যু। ফলে আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করার পেছনে বিপুল সময় ব্যয় করার সময় কি ভারতের আছে?
তাহলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার পথ কী? সম্ভবত এখনও এটি কেউ জানে না। এমনকি খোদ আওয়ামী নেতৃত্বও নয়!




