বাসায় টবের একটা গাছে একটা ফুল ফুটেছে। ফুল এত বড় হয়? হ্যাঁ হয়। এটি বিশ্বের কোনো স্থূলপর্ণী বা সাকুলেন্ট জাতীয় গাছের সবচেয়ে বড় ফুল! জানতেই ফুলটার প্রতি যেন কদর বেড়ে গেল, এমন একটা ফুলকে প্রত্যক্ষ করা কজনের ভাগ্যে জোটে!
ফুলটা মাপার জন্য ফিতা নিয়ে এলাম। তারার মতো ফোটা ফুলের পাপড়ির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত মেপে পাওয়া গেল ৩০ সেন্টিমিটার! একটি ফুল প্রস্ফুটিত অবস্থায় পাপড়ির বিস্তার এক ফুট!
দুই বছরের বেশি সময় ধরে গাছটা আমাদের ঘর-ছাদ ঘুরে বেড়াচ্ছে। কখনও টবের সেই গাছটাকে ঘরে রাখি, কখনোবা কয়েক দিনের জন্য রেখে আসি ছাদে। টবের ভেতরে ধাঁই ধাঁই করে গাছ বাড়ে, কাণ্ডগুলো আকাশের দিকে খাড়া হয়ে থাকে, একসময় সেসব কাণ্ড থেকে কিছু শাখা-প্রশাখা বের হয়। তখন কাণ্ডগুলো ভারী হয়ে মাটির দিকে নত হতে থাকে। বাতাসে দুলতে দুলতে সেগুলো ছাদের ঘষায় কখনও আহত হয়।
ঝুলন্ত শাখা কেটে তাকে অন্য একটা টবের মাটিতে পুঁতে দিই। কয়েক দিনের মধ্যেই একটু যত্ন-আত্তি পেয়ে সে অপত্য গাছ নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ গাছ হয়ে ওঠে। খুব বাড়লেও গাছটা কখনও আট-দশ ইঞ্চির বেশি লম্বা হতে দেখিনি। কিন্তু ওই ছোট্ট গাছেই যে এত্ত বড় ফুল ফুটতে পারে, তা ছিল কল্পনাতীত।
গাছ লাগানোর পর প্রায় দুই বছরের মাথায় এই প্রথম চারটি অদ্ভুত কুঁড়ি দেখলাম। চোখা মাথা চতুষ্কোণাকার বেলুনের মতো কুঁড়িগুলো বেরিয়েছে ডালের পাশ থেকে। লম্বা বোঁটা, হালকা লালাভ ঘিয়া রং। এ রকম অদ্ভুত কুঁড়ি কখনও চোখে পড়েনি।
কুঁড়ি ধীরে ধীরে আরও বড় হয়, ফোলে। একদিন একটা কুঁড়ির বোঁটার থেকে শীর্ষ পর্যন্ত দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ১৮ সেন্টিমিটার। রাতে ঘুমুতে যাই। ঝুমবৃষ্টি নামল। কী হবে ছাদে রাখা গাছটার! ফুলের কুঁড়িটা ফোটার আগেই কি ঝরে যাবে?
পরদিন সকাল হতেই ছাদে গেলাম। না, চারটি কুঁড়ির মধ্যে একটি ফুল হয়ে ফুটেছে। ওইটুকু ছোট গাছে যে এত বড় ফুল ফুটতে পারে– বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ফুলটার গড়ন দেখতে অবিকল তারা মাছের মতো বলে এর ইংরেজি নাম ‘স্টারফিশ ফ্লাওয়ার’, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Stapelia gigantea ও গোত্র অ্যাপোসাইনেসি। কুঁড়ি দেখতে পেটফোলা কোলা ব্যাঙের মতো, সেজন্য এর আর একটা ইংরেজি নাম ‘টোড প্লান্ট’।
গাছটা যে কেউ দেখলে বলবে, ওটা তো ক্যাকটাস গাছ। ক্যাকটাসের মতো শির তোলা। কাণ্ড, কাণ্ডের চারটি শিরে সারি ধরা তীক্ষ্ণ কাঁটা। তফাতটা হলো, এর কাণ্ড রসালো, নরম, বিড়ালের নখের মতো বাঁকানো ছোট কাঁটাগুলোও নরম। খরাতেও মরে না।
ফুলের ঘ্রাণটা সুখকর না, সামান্য পচা মাংসের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। এই বদ গন্ধ মাছিদের আকৃষ্ট করে। এক ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য ডায়ামিন, সালফার ও বিভিন্ন ফেনোলিক যৌগ এ বদ গন্ধের জন্য দায়ী। সারা বছর ফুল ফোটার কথা থাকলেও এ বছর গ্রীষ্মকালে এ ফুলের দেখা পেলাম। ফুল ফোটার পর প্রথম ফুলটা রইল দুদিন, পরেরগুলো গাছে রইল তিন থেকে চার দিন। এর পর ঢলে শুকিয়ে গেল। আবার কবে দেখব সেই অপ্সরাকে, কে জানে!




