শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সঙ্গে অন্য কোনো তালিকাভুক্ত বা অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণে শেয়ারহোল্ডার ও হাইকোর্টের অনুমোদন নিতে হয়। এ বিষয়ে কোনো আইনি বিধান না থাকায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পর্যবেক্ষণ বা অনুমোদন নেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
বিএসইসি বলছে, এ-সংক্রান্ত প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে প্রথমবারের মতো বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (করপোরেট রিস্ট্রাকচারিং) রুলস, ২০২৬ নামে এ বিধিমালার খসড়া জনমত যাচাইয়ের জন্য সংস্থাটি প্রকাশ করেছে। আগামী ৭ জুনের মধ্যে অংশীজনদের এ বিষয়ে মতামত পাঠাতে অনুরোধ করছে সংস্থাটি।
প্রস্তাবিত এই বিধিমালা প্রণয়নের উদ্দেশ্য বিষয়ে কমিশন বলেছে, করপোরেট পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সঠিক মূল্যায়ন, পর্যাপ্ত তথ্য প্রকাশ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারী বিশেষ করে সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা পায়।
একীভূতকরণ বা অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে বর্তমান কোম্পানি আইন অনুযায়ী হাইকোর্টের অনুমোদন নিয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি। এ প্রক্রিয়ায় বিএসইসির পক্ষভুক্ত হয়ে মত দেওয়ার সুযোগ থাকলেও অতীতে সিংহভাগ ক্ষেত্রে স্বার্থান্বেষী মহলের পক্ষে মত দিয়েছে বা মতামত প্রদান থেকে বিরত থেকেছে বিএসইসি। ফলে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ লঙ্ঘিত হয়েছে।
মার্জার বা একীভূতকরণ হলো–দুই বা ততধিক কোম্পানি একটি কোম্পানিতে রূপান্তর করা। এক্যুইজিশন বা অধিগ্রহণ হলো একটি কোম্পানি যখন অন্য কোম্পানিকে কিনে নিজের করপোরেট কাঠামোর মধ্যে নিয়ে পরিচালনা করে। উভয়ক্ষেত্রে একাধিক কোম্পানি শেষ পর্যন্ত একটি কোম্পানি হিসেবে পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে আগের যেকোনো একটি কোম্পানির নামে পুনর্গঠিত কোম্পানি কার্যক্রম চালাতে পারে। অথবা নতুন কোনো নামও ধারণ করতে পারে।
বিএসইসির খসড়া বিধিমালা অনুমোদন হলে কমিশনের পর্যবেক্ষণ ছাড়া কোনো মার্জার বা একুইজিশন স্কিম বাস্তবায়নে পরবর্তী ধাপে যাওয়া যাবে না। খসড়া বিধিমালা অনুযায়ী, শেয়ার বিনিময়ের হার বা কনভারশন রেট নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনতে কোম্পানিগুলোকে বিএসইসি নির্ধারিত প্যানেলভুক্ত অডিট ফার্ম বা মার্চেন্ট ব্যাংকারকে স্বাধীন মূল্যায়নকারী হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।
পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ও আইনি কাঠামো
খসড়া বিধিমালায় বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করলে প্রথমে তার পরিচালনা পর্ষদে সেটি অনুমোদন করতে হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জে পর্যবেক্ষণ নিতে জমা দিতে হবে। বিএসইসি এবং স্টক এক্সচেঞ্জ পর্যবেক্ষণ দেওয়ার পর বিশেষ সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের সভায় (ইজিএম) বিশেষ প্রস্তাবের মাধ্যমে এটি অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদনের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা, পরিচালক এবং ৫ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণকারীদের বাদে উপস্থিত সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের অন্তত ৭৫ শতাংশের সম্মতি প্রয়োজন হবে। চূড়ান্ত পর্যায়ে কোম্পানিকে মহামান্য হাইকোর্টের অনুমোদন নিতে হবে।
মূল্যায়ন পদ্ধতি ও তদারকি
খসড়া বিধিমালা অনুসারে, সম্পদ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে কমিশন নির্ধারিত প্যানেল অডিটর বা মার্চেন্ট ব্যাংকারকে স্বাধীন মূল্যায়নকারী হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। সম্পদ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দুটি ভিন্নধর্মী পদ্ধতি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে বলা হয়েছে, স্বকীয় মূল্যায়ন পদ্ধতিগুলো (অ্যাবসলিউট ভ্যালুয়েশন) এবং তুলনামূলক মূল্যায়ন পদ্ধতি (রিলেটিভ ভ্যালুয়েশন) থেকে অন্তত দুটি করে পদ্ধতি অনুসরণ করে থেকে সম্পদ মূল্যায়ন এবং শেয়ার বণ্টন অনুপাত নির্ধারণ করতে হবে। স্বকীয় সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নিজস্ব আয় ও নগদপ্রবাহের মতো মৌলিক ভিত্তিগুলো দেখা হয় এবং তুলনামূলক মূল্যায়ন পদ্ধতিতে সমজাতীয় অন্য কোম্পানির সঙ্গে তুলনা করে দাম নির্ধারণ করা হয়।
প্রতিবেশী দেশ ভারত ছাড়াও উন্নত দেশগুলোতে করপোরেট পুনর্গঠনের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই শক্তিশালী আইনি কাঠামো অনুসরণ করছে। ভারতে কোম্পানি আইনের অধীনে এনসিএলটি নামক বিশেষ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া তদারকি করে, যা উচ্চ আদালতের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে।
এদিকে একীভূতকরণ বা অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার ফলে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ওপর কী প্রভাব পড়বে সে বিষয়ে একটি পৃথক প্রতিবেদন দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে খসড়া বিধিমালায়। যারা এমন স্কিমের বিপক্ষে মত দেবেন বা ভিন্নমতালম্বী হবেন, তাদের একটি তালিকাও কমিশনকে দিতে হবে।
খসড়া এ বিধিমালাকে স্বাগত জানিয়েছেন মার্চেন্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে পুরো স্কিম সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের সবার পছন্দ নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে কেউ যদি নতুন ব্যবস্থায় শেয়ারহোল্ডার থাকতে না চান, তার শেয়ার ছেড়ে দেওয়ার পদ্ধতি আছে। এ বিধানে এ বিষয়ে নিয়ম রাখা যেত।
জানতে চাইলে ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, এতদিন যত একীভূতকরণ বা অধিগ্রহণ হয়েছে, তার সিংহভাগ ক্ষেত্রে জাল-জালিয়াতি হয়েছে, সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ঠকেছেন। কমিশন এই জালিয়াতি কীভাবে ঠেকাবে এবং সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা করবে–এ বিষয়গুলো দেখতে হবে।




