চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) সরকারের পরিচালন ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ লাখ ১৫ হাজার ৫৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া বরাদ্দ অনুসারে পরিচালন ব্যয়ের হারও বেড়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম মাসে পরিচালন ব্যয় ছিল এ খাতে মোট বরাদ্দের ৬২ শতাংশ, যা এবার বেড়ে হয়েছে ৬৩ শতাংশ।
অন্যদিকে, পরিচালন ব্যয় বাড়লেও উন্নয়ন ব্যয়ের বাস্তবায়ন কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন হার গত বছরের তুলনায় ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে ব্যয় ছিল ৭১ হাজার ১৪২ কোটি টাকা, যা এবার কমে দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ৫৪ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের হালনাগাদ বাজেট বাস্তবায়ন প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আর্থিক খাতে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রভাব ব্যাংক খাত পেরিয়ে পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এমন প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতির ক্ষত সারাতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ে লাগাম টানার ঘোষণা দেয়। এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা সামনে রেখে সম্প্রতি পরিচালন ব্যয়ে নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করে প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে নতুন সরকার। বাস্তবে পরিচালন বাজেটের আওতায় ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়েই চলেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিচালন ব্যয় বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো দেশি ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান চাপ। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সার খাতে বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন ও বিশেষ প্রণোদনা বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের ফলে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারের অনুৎপাদনশীল ব্যয় আরও বাড়ছে।
এদিকে, দেশি-বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধেও সরকারের ব্যয় বেড়েছে। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৯৬ হাজার ২৩১ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেট মিলিয়ে সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। পরিচালন ব্যয় বাড়ার প্রভাবে এ সময়ে মোট বাজেট বাস্তবায়ন হারও বেড়ে ৫২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
পরিচালন ব্যয়ের চেয়ে কম রাজস্ব আয়
পরিচালন ব্যয়ের চাপ বাড়তে থাকায় সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের চেয়ে পরিচালন ব্যয় বেশি হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু উন্নয়ন ব্যয় নয়, বেতন-ভাতা, সুদ ও ভর্তুকির মতো পরিচালন ব্যয়ের একটি অংশও সরকারকে ঋণ নিয়ে মেটাতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মোটেও ইতিবাচক নয়।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৩ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে সরকারের মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ উন্নয়ন ব্যয়ের ৫৭ হাজার কোটি টাকার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয়েরও প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা সরকারকে ঋণ নিয়ে মেটাতে হয়েছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয় প্রায় সাড়ে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি ছিল।
এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সমকালকে বলেন, সাধারণত রাজস্ব আয় দিয়েই পরিচালন ব্যয় মেটানো হয় এবং সেখান থেকে কিছু অর্থ উন্নয়ন ব্যয়েও ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বর্তমানে রাজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয়ই ঠিকমতো মেটানো যাচ্ছে না, যা উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, সরকারের উচিত পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।
এদিকে, মোট ব্যয়ের তুলনায় রাজস্ব আয় কম হওয়ায় চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা।




