আজ পবিত্র হজ, দুয়ারে ঈদ

0
7

ত্যাগের বাণী নিয়ে বছর ঘুরে এসেছে মনের পশুত্ব ত্যাগ করে লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষকে পরাভূত করার সময়। এসেছে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের উত্তম সময়। আজ মঙ্গলবার পবিত্র হজ। সারা বিশ্ব থেকে সমবেত হওয়া লাখো হাজির কণ্ঠে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দা, ওয়ান নিইমাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক’ ধ্বনিতে মুখর হবে আরাফাতের ময়দান। সৌদি আরবে পবিত্র ঈদুল আজহা আগামীকাল। বাংলাদেশে বৃহস্পতিবার উদযাপিত হবে ঈদ।

চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে হজ করতে সৌদি আরব গেছেন প্রায় ৭৮ হাজার হাজি। বিভিন্ন দেশের ও স্থানীয় হজযাত্রী মিলে হাজির সংখ্যা এ বছর ১৬ লাখের মতো। ধর্মপ্রাণ এই মুসলমানরা সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর দরবারে হাজিরা দিতে আজ পবিত্র হজের প্রধান আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিচ্ছেন। ধর্মীয় আবেগ ও অনুভূতির মধ্য দিয়ে ইসলাম ধর্মের পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে অন্যতম স্তম্ভ হজের দ্বিতীয় রুকন আদায়ের জন্য তারা মিনা থেকে আরাফাতের ময়দানে সমবেত হন। সূর্যাস্ত পর্যন্ত বিদায় হজের স্মৃতিবিজড়িত এই ময়দানে অবস্থান করবেন তারা।

আরাফাত ময়দানের মসজিদে নামিরা থেকে জোহরের নামাজের শেষ ওয়াক্তে হজের খুতবা পাঠ করা হবে। এরপর সেখানে সমবেতরা এক আজান ও দুই ইকামতে জোহর ও আসরের নামাজ একসঙ্গে জামাতে আদায় করবেন। এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও দোয়ায় অংশ নেবেন। এ বছর আরাফার ঐতিহাসিক খুতবা দেবেন মসজিদে নববির প্রধান ইমাম ও খতিব শায়খ আলি বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তের পর কিছু সময় পর্যন্ত আরাফাতের ময়দানেই অবস্থান করবেন হাজিরা। সূর্য অস্ত যাওয়ার পরে মাগরিবের নামাজ আদায় না করেই আরাফাতের ময়দান থেকে মুজদালিফার উদ্দেশে রওনা দেবেন তারা।

ত্যাগের ঈদ, আনন্দের ঈদ 
বাংলাদেশে ঈদুল আজহায় সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর পথে পশু কোরবানি করবেন। পশু প্রতীক মাত্র। কবি নজরুল বলেছেন– ‘মনের পশুরে করো জবাই/ পশুরাও বাঁচে, বাঁচে সবাই।’
ইসলাম ধর্মমতে, মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ট হন নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি করার। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে তাঁর সবচেয়ে প্রিয়, আদরের ধন পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কেই কোরবানির সিদ্ধান্ত নেন ইব্রাহিম (আ.)। পিতার এই সিদ্ধান্ত সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেন পুত্র ইসমাইল (আ.)।

Untitled 1 1779767389

এরপর ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানির প্রস্তুতি নেন পিতা ইব্রাহিম (আ.)। কিন্তু আল্লাহতায়ালা ইব্রাহিমের (আ.) কঠোর আনুগত্য ও ত্যাগকে গ্রহণ করেন। ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে কোরবানি হয় একটি দুম্বা। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই ত্যাগের মহিমার স্মরণে মুসলমানরা প্রতি বছরের ১০ জিলহজ তারিখে আল্লাহর অনুগ্রহ লাভে কোরবানি করেন।

এই পশু কোরবানি সম্পূর্ণ রূপক। আল্লাহর পথে ত্যাগই ঈদুল আজহার প্রধান শিক্ষা। পশু জবাই করে তা বিলিয়ে দেওয়া দান নয়, ত্যাগ। তাই তো কবি নজরুল ঈদজ্জোহা কবিতায় বলে গেছেন– ‘চাহি নাকো দুম্বা উট, কতটুকু দান? ও দান ঝুট। চাই কোরবানি, চাই না দান।’

সামর্থ্যবানদের জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব। সামর্থ্যবানরা নিজেদের নামে, প্রিয়জনের নামে পশু কোরবানি দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি আদায়ে সচেষ্ট হবেন। যাদের সামর্থ্য নেই, তারাও বাদ যাবেন না ঈদের আনন্দ থেকে। কেননা, কোরবানির পশুর গোশত তিন ভাগ করা উত্তম। এর মধ্যে এক ভাগ বিলিয়ে দিতে হয় গরিব মিসকিনকে। আত্মীয়দের দিতে হয় এক ভাগ। আর অবশিষ্ট এক ভাগ নিজের ও পরিবারের জন্য। প্রতিবছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখ পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়। তবে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী পবিত্র এই মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখের যে কোনো দিন পশু কোরবানি দেওয়া যায়। সে হিসাবে আগামী শুক্র ও শনিবারও কোরবানি করা যাবে।

নাড়ির টানে শহরবাসী কোটি মানুষ পথের ভোগান্তি জয় করে ফিরছেন শিকড়ের কাছে। ঈদগাহ ময়দানও প্রস্তুত। সকালের শুরুতেই মুসল্লিরা ঈদগাহে যাবেন ঈদুল আজহার দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায়ে। ফিরে এসে আল্লাহর পথে পশু কোরবানি করবেন।

প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদের প্রধান জামাত হবে সকাল সাড়ে ৭টায় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে সকাল ৭টা থেকে হবে পাঁচটি ঈদ জামাত। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আয়োজনে বিভিন্ন মসজিদ ও মাঠেও হবে ঈদের জামাত।

ত্যাগের দিন হলেও তো ঈদ বলে কথা! ত্যাগের এই ঈদ বাঙালি মুসলমানরা উদযাপন করেন দারুণ জৌলুসে। বাংলাদেশে ইসলাম আগমনের প্রথম যুগে ঈদ সাদামাটাভাবে উদযাপন করা হলেও মোগল ও নবাবি আমলে ঈদ উৎসবের রূপ পায়। সতেরো শতকে পরিব্রাজক মির্জা নাথানের ‘বাহরিস্তানে গায়েবী’ বইয়ে বাঙালির বর্ণিল ঈদের বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি লিখেছেন, ঈদে বাঙালি মুসলমানরা একে অন্যের বাড়িতে যান। অতিথির জন্য আহারের ব্যবস্থা থাকে। ঈদের দিনে মুসলমানরা সুন্দর পোশাক পরে। অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তিরা মুক্ত হস্তে দান করেন। সেই ধারায় আজও ঈদ উদযাপিত হয় জৌলুসের সঙ্গেই।
ঈদ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতাসহ শীর্ষ রাজনীতিবিদরা দেশবাসীকে আনুষ্ঠানিক ঈদের শুভেচ্ছা জানান। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না। ঈদুল আজহা উপলক্ষে এবার সরকারি ছুটি সাত দিনের। পত্রিকায় ছুটি থাকবে পাঁচ দিন। হাসপাতাল, শিশুসদন, আশ্রয়কেন্দ্র ও কারাগারে বিশেষ খাবার দেওয়া হবে ঈদের দিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here