ঈদুল আজহা উপলক্ষে পাবনার সাথিয়ার মেওয়াপুর থেকে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি পশুর হাটে ১৩টি গরু এনেছেন ব্যাপারী মো. আলাউদ্দিন। কিন্তু দুদিনের ঝড়বৃষ্টির কারণে হাটের সামিয়ানা যেমন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে, তেমনি পানি-কাদায় সয়লাব হয়ে গেছে পুরো জায়গাটা। এখন গরুগুলো যে ঠিকমতো দাঁড়িয়ে বা বসে থাকবে, সে অবস্থা নেই। গরুর খুব কষ্ট হচ্ছে। সেই সঙ্গে ব্যাপারীরও ভোগান্তির শেষ নেই।
আলাউদ্দিন বলেন, বৃষ্টির কারণে তীব্র
গরম থেকে স্বস্তি মিলেছে। গরমে পশুর হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কমেছে। কিন্তু এখন দেখা দিয়েছে নতুন যন্ত্রণা।
এ চিত্র কেবল দিয়াবাড়ির হাটের পশু ব্যাপারীদের নয়, এটি রাজধানীর প্রতিটি পশুর হাটের। অনেক হাটে তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি দেখা গেছে কাজলা ব্রিজ থেকে মাতুয়াইল মৃধাবাড়ী পর্যন্ত এলাকাজুড়ে বসা পশুর হাটে। সেখানে হাটের প্রায় ২৫ শতাংশ এলাকা হাঁটু সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে পশুগুলোকে দীর্ঘ সময় পানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
হাটের ইজারাদার প্রতিষ্ঠান কেবি ট্রেডার্সের মালিক শামীম খান বলেন, জলাবদ্ধতা শুধু হাটকেন্দ্রিক সমস্যা নয়, বরং পুরো নগরের দীর্ঘদিনের সমস্যা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হাট কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে পানি নিষ্কাশনের জন্য পাম্প বসিয়েছে; পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকদের মাঠে নামানো হয়েছে। সিটি করপোরেশনকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।
ব্যাপারীরা জানান, বৃষ্টিপাতের কারণে বেচাবিক্রি কম। ক্রেতারা হাটে প্রবেশ করতে পারছেন না। এ জন্য গত দুদিনে তেমন পশু বিক্রি হয়নি। আজ ও আগামীকাল আবহাওয়া ভালো থাকলে বেচাবিক্রি জমবে।
কমলাপুর, কচুক্ষেত ও গাবতলী পশুর হাট ঘুরেও একই চিত্র দেখা গেছে। ভারী বৃষ্টিতে কাদাপানি মাড়িয়ে ক্রেতাদের হাটে ঢুকতে হচ্ছে। এ ভোগান্তির কথা চিন্তা করে গতকাল অনেকেই হাটে ঢোকেননি।
হাটগুলো ঘুরে এবার প্রচুর পশু আমদানির চিত্র চোখে পড়েছে। ছোট-মাঝারি ও বড় আকৃতির গরুও উঠেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন আকৃতির ছাগল, ভেড়া, মহিষও উঠেছে। ভুটানি জাতের কিছু গরু দেখা গেছে হাটে।
কমলাপুর পশুর হাটে ২৭ মণ ওজনের ‘প্রেসিডেন্ট’ নামের একটি ফ্রিজিয়ান জাতের গরু এনেছেন ফরিদপুরের নগরকান্দার ব্যবসায়ী মতিউর রহমান। সেটার দাম চাইছেন ১২ লাখ টাকা। কিন্তু কেউ চাহিদামতো দাম বলেননি। হাটে পশু কিনতে যাওয়া শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘আমরা এক লাখ টাকায় একটি গরু কিনেছি, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০ হাজার টাকা বেশি। তিন মণ মাংসও হবে বলে মনে হয় না।’
বিক্রেতারা বলেছেন, পশু খাদ্যের দাম বাড়ায় গতবারের তুলনায় দাম কিছুটা বেশি। তবে দামে মিললেই বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। ঈদের আগেই সব গরু বিক্রির প্রত্যাশা ব্যবসায়ীদের। তবে শঙ্কা সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু আসলে গুনতে হবে লোকসান।
নজর কাড়তে পশুর হরেক রকম নাম
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে পশুর হাটে উৎসুক মানুষের আকর্ষণ বাড়াতে খামারি ও ব্যবসায়ীরা কোরবানির পশুর বিভিন্ন নাম রেখেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন, এমনকি আলোচিত-সমালোচিত রাজনীতিবিদ ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী’ নামেও রাখা হয়েছে গরুর নাম।
পশু ব্যবসায়ী সুরুজ মিয়া বলেন, এ রকম নাম রাখলে ফেসবুকে ভাইরাল হয়। লোকজন ভিড় করে। দামও বাড়ে। এ জন্য তাঁর মহিষের নাম ‘ডিপজল’।
গরুর দাম বেশি
খামারি ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছরের মতো এবারও ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। যে হাটগুলো বসছে সেখানে ছোট ও মাঝারি আকারের গরু বেশি। ছোট গরু হলেও লাখ টাকার নিচে তেমন গরু নেই। চার থেকে সাড়ে চার মণ মাংস হবে- এমন গরুর দাম দেড় লাখ টাকার ওপর হাঁকছেন বিক্রেতারা।
ধোলাইখাল পশুর হাটের ক্রেতা সুমন তালুকদার বলেন, এ বছর সব হাটেই গরুর দাম অনেক চড়া। যে গরুর দাম এক লাখ ৩০ হাজার টাকা চায়, সেটা আমার কাছে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা মনে হয়। অর্থাৎ প্রতিটি গরুর দাম ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা বেশি বলছেন বিক্রেতারা।
সীমানা ছাড়িয়ে পশুর হাট
কতটুকু এলাকার মধ্যে পশুর হাট বসবে, সে বিষয়ে একটি চৌহদ্দি নির্ধারণ করে দেয় সিটি করপোরেশন। কিন্তু বেশিরভাগ ইজারাদারই সেই চৌহদ্দি মানেন না। যেমন তেজগাঁও টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে কেবল হাট বসার কথা। কিন্তু সেই হাট এখন পুরো তেজগাঁও শিল্প এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে ওই এলাকার সড়কগুলো দিয়ে যান চলাচলই বন্ধ হয়ে গেছে।
একই অবস্থা দিয়াবাড়ি-বনশ্রী, ধোলাইখালসহ অন্যান্য হাটেও। গতকাল সোমবার ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান নিজে দিয়াবাড়ি হাটে গিয়ে দেখেন নির্ধারিত এলাকার বাইরে আরও বিপুল এলাকাজুড়ে হাট বসানো হয়েছে। এমনকি উত্তরা সেন্টার মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে সড়কে ডাইভারশন দিয়ে পশু বেঁধে রাখা হয়েছে।
বিষয়টি দেখে প্রশাসক ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং কোনোভাবেই যেন রাস্তায় পশুর হাট বিস্তৃত না হয় সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেন। পরে পশুগুলোকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় প্রশাসক ইজারাদারের সঙ্গে ফোনেও কথা বলেন। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের নির্দেশনা অমান্য করলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা করা হবে।
পরে ইজারাদারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বৃষ্টির কারণে সাময়িক সময়ের জন্য মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে কোরবানির পশু রাখা হয়েছিল। তারা ডিএনসিসির নির্দেশনা মেনে চলছেন এবং রাস্তায় যেন কোনোভাবেই পশু না রাখা হয় সে ব্যবস্থাও নিচ্ছেন।
এর আগে গাবতলী পশুর হাট পরিদর্শনে যান ডিএনসিসি প্রশাসক। এ সময় হাসিলের অতিরিক্ত কোনো ধরনের অর্থ আদায় না করার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেন তিনি। পাশাপাশি পশুর হাটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে দায়িত্বরত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন।
পরে রাজধানীর ৩০০ ফিট, বেরাইদ ও স্বদেশ প্রপার্টিজের খালি জায়গায় স্থাপিত অস্থায়ী পশুর হাট পরিদর্শন করেন তিনি।



